প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৪ পিএম
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অভাবে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসমাইল মুন্সী উচ্চ বিদ্যালয়
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর কয়েক কিলোমিটার দূরের বিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হতো শিক্ষার্থীদের। যাতায়াতের দূরত্ব ও খরচের কারণে অনেক পরিবারের সন্তানদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তায় পড়ত। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে এগিয়ে আসেন উত্তর দারাগাঁও গ্রামের মুন্সীবাড়ির সন্তান ও আমেরিকাপ্রবাসী রাজা আহমদ মুন্সী। তাঁর উদ্যোগে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসমাইল মুন্সী উচ্চ বিদ্যালয়।
অঞ্চলটিতে দারাগাঁও, উত্তর দারাগাঁও, টিলাগাঁও, কোনাউরা ও খনকারীগাঁওসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম এবং দারাগাঁও ও হাতিমারা চা-বাগান এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস এ অঞ্চলে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব এলাকার অনেক শিক্ষার্থীর জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন ছিল। কোনো কোনো এলাকা থেকে কাছের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব ছিল চার থেকে ছয় কিলোমিটার। পথের বড় অংশ হেঁটে পাড়ি দিতে হতো। আবার বাহুবল উপজেলার মিরপুর এলাকার বিদ্যালয়ে পড়তে গেলে যাতায়াতসহ বাড়তি খরচ বহন করতে হতো।
নিম্ন আয়ের পরিবারের পক্ষে নিয়মিত এসব খরচ বহন করা ছিলো বেশ কঠিন। বিশেষ করে চা-বাগান এলাকার দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা ছিল বেশি। ফলে এলাকায় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই অনুভব করছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পুরোনো ভবনে শুরু, এখন নিজস্ব ক্যাম্পাসের উদ্যোগ:-
নিজ এলাকার সন্তানদের মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন রাজা আহমদ মুন্সী। শুরুতে মুন্সীবাড়ির পুরোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন ও পরিবারের বসতভিটায় পাঠদান চলত। পরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় বাড়ির আশপাশের জমি ভরাট করে শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে সেখানেই চলছে বিদ্যালয়ের পাঠদান।
বিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজও চলছে। গ্রামের পশ্চিম দিকে করাঙ্গী নদীর তীরসংলগ্ন স্থানে ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে ইতিমধ্যে একটি ভবন ও একটি খেলার মাঠ তৈরি করা হয়েছে।
স্থায়ী ক্যাম্পাসের কাজ শেষ হলে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও ভালো পরিবেশে পাঠদানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
চা-বাগান এলাকার শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ:-
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “রাজা আহমদ মুন্সীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও এলাকাবাসীর অনুপ্রেরণার মাধ্যমে আজ প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার মানও দিন দিন উন্নত হচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি সবার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও সহযোগিতা কামনা করছি।”
প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, ইসমাইল মুন্সী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এ অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়েও চা-বাগানবেষ্টিত জঙ্গলবাড়ি এলাকায় এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থী ছিল না। এখন সেখানকার শিক্ষার্থীরাও বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। তাদের কেউ কেউ এসএসসি পাস করে কলেজে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে।
বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ফলে আশপাশের গ্রামের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি চা-বাগান এলাকার শিশু-কিশোরদেরও মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এ অগ্রগতি ধরে রাখতে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রয়োজন সবার সহযোগিতা:-
প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি সেখানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক, শিক্ষা উপকরণ ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এ জন্য প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষক, অভিভাবক, এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
চুনারুঘাটের পূর্বাঞ্চলে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ইসমাইল মুন্সী উচ্চ বিদ্যালয়ের উদ্যোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের একটি প্রয়োজন পূরণ করেছে। বিদ্যালয়টির স্থায়ী ক্যাম্পাসের কাজ শেষ হলে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠদানের পরিবেশ আরও উন্নত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এখন শিক্ষার মান ধরে রাখা ও আরও বেশি শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক শিক্ষার আওতায় আনাই হবে প্রতিষ্ঠানটির সামনে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
- জাফর আকরাম, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ।
