রবিবার ১৮, অক্টোবর ২০২৬

রবিবার ১৮, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --

ঢাকের তালে কুবি শিক্ষার্থীদের মনে উৎসবের রং

কুবি থেকে আহসান হাবিব রাফি

প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম

ফাইল ছবি

শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের দোলা আর শিউলি ফুলের সুবাস জানান দিচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা। প্রকৃতির এই স্নিগ্ধতার সঙ্গে ঢাকের বাদ্য আর উৎসবের আমেজে মেতে ওঠার অপেক্ষায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা হলেও এর আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার মাঝে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীদের কাছেও দুর্গোৎসব মানে শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের কাছে ফেরার আকুলতা, সম্প্রীতির বন্ধন আর নতুন কিছু প্রত্যাশা।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের ব্যস্ততা, ক্লাস-পরীক্ষা আর নানা দায়িত্বের ভিড়ে শিক্ষার্থীদের কাছে দুর্গাপূজা যেন একটু থেমে নিজের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার উপলক্ষ। বিশেষ করে বাড়ি থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে এই উৎসবের আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে পরিবারের সান্নিধ্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। কারও মনে ভেসে ওঠে শৈশবের পূজামণ্ডপ, ঢাকের শব্দ আর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কাটানো আনন্দঘন মুহূর্ত; কেউবা স্বপ্ন দেখেন ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে সম্প্রীতি ও মানবিকতার বন্ধনে রাঙিয়ে উঠুক ক্যাম্পাসসহ পুরো দেশ।

শৈশবের পূজা, স্মৃতির পাতায় হারানো দিন

দুর্গাপূজা অনেকের কাছে কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়, বরং শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য স্মৃতির নাম। সময়ের পরিবর্তনে উৎসবের আয়োজন ও উদ্‌যাপনের ধরন বদলে গেলেও স্মৃতির পাতায় রয়ে যায় সেই দিনগুলোর মায়া। বাংলা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শ্রাবন্তী শাহা ছোটবেলার পূজার স্মৃতিচারণ করে বলেন,

“এখনকার পূজা আর আগের পূজার মধ্যে অনেক ফারাক। ছোটবেলায় দেখতাম, পূজা আসার আগেই গ্রামে বা পাড়ায় একটা অন্যরকম উৎসবের আমেজ তৈরি হতো। সবাই মিলে মণ্ডপ সাজানো, ভোর হতে না হতেই ঢাকের শব্দে ঘুম ভাঙা, বড় একটা যৌথ পরিবারে সব ভাই-বোন আর আত্মীয়রা একসঙ্গে হওয়া, রাত জেগে আড্ডা আর মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো—এই জিনিসগুলো এখন আর তেমন দেখাই যায় না। জীবনের ব্যস্ততা আর একক পরিবারের যুগে আগের সেই ঘরোয়া উৎসবের আমেজটা যেন আস্তে আস্তে হারিয়েই যাচ্ছে। সারাটা বছর আমরা পরিবার থেকে দূরে থাকি, তাই এই পূজার দিনগুলোই আমাদের হারিয়ে যাওয়া সেই শৈশব আর প্রিয় মানুষদের সঙ্গে কাটানোর একমাত্র সুযোগ।”

শ্রাবন্তীর কথায় ফুটে ওঠে সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া উৎসবের চিত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত জীবনে পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে পূজার ছুটি তাই শুধু অবকাশ নয়, বরং প্রিয়জনদের সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধন নতুন করে অনুভব করার সময়।

উৎসবের রঙে সম্প্রীতির প্রত্যাশা

দুর্গোৎসবের আনন্দ ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের প্রত্যাশাও। ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর কুবি ক্যাম্পাসে উৎসবকে ঘিরে সম্প্রীতির বার্তাই গুরুত্ব পাচ্ছে।

একই শিক্ষাবর্ষের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী আদিত্য শাহার  দুর্গাপূজাকে ঘিরে নিজের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে বলেন,

“শরতের স্নিগ্ধ প্রকৃতি, কাশফুলের দোলা আর শিউলির সুবাসে জানান দেয় মা দুর্গার আগমনী বার্তা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতন শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, দেবীর আগমনে পৃথিবী থেকে দূর হোক যুদ্ধ, হিংসা ও রক্তপাত। নারীরা সাহস পাক সব অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর, প্রতিটি মানুষ বাঁচুক নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে। ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে গড়ে উঠুক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মানবতার বন্ধন। কুবি ক্যাম্পাসের এই সম্প্রীতি ছড়িয়ে পড়ুক পুরো বাংলাদেশে। মা দুর্গার আগমনে পৃথিবী হোক শান্তিময়, বাংলাদেশ হোক সম্প্রীতির, আর মানুষের হৃদয় ভরে উঠুক ভালোবাসায়।”

আদিত্যের প্রত্যাশায় ধর্মীয় উৎসব ছাড়িয়ে উঠে এসেছে শান্তি, নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা ও সাম্যের আকাঙ্ক্ষা। শিক্ষার্থীদের কাছে উৎসবের সার্থকতা তাই শুধু আনন্দ উদ্‌যাপনে নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলায়, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও মানুষের মধ্যে থাকবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা।

ছুটিতে স্বস্তি, উৎসবে পরিবারের সান্নিধ্য

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় করে উৎসবের ছুটি নির্ধারণ করা শিক্ষার্থীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বাড়ি থেকে দূরে থাকা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য সীমিত ছুটিতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দুর্গাপূজার পরপরই লক্ষ্মীপূজা থাকায় ছুটির বিষয়টি তাঁদের কাছে বাড়তি গুরুত্ব বহন করে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের  শিক্ষার্থী সজীব বিশ্বাস বলেন,

“কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সনাতন শিক্ষার্থী হিসেবে দুর্গাপূজা আমাদের কাছে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি পরিবার, সংস্কৃতি ও শিকড়ের সঙ্গে আমাদের গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার একটি সময়। আমরা চাই, দুর্গাপূজার ছুটি এমনভাবে নির্ধারিত হোক, যাতে শিক্ষার্থীরা পরিবারের সঙ্গে থেকে পূজার আনন্দ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারে। একই সঙ্গে দুর্গাপূজার পরপরই অনুষ্ঠিত লক্ষ্মীপূজায় অন্তত একদিনের ছুটি দেওয়ার বিষয়টি আগামী বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এটি কোনো বিশেষ সুবিধার দাবি নয়; বরং ধর্মীয় উৎসব যথাযথভাবে পালনের জন্য শিক্ষার্থীদের একটি স্বাভাবিক প্রত্যাশা। আমরা আশা করি, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সব ধর্মের শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সমান সম্মান রেখে একটি সুন্দর, মানবিক ও সম্প্রীতিপূর্ণ ক্যাম্পাস গড়ে তুলবে।”

শিক্ষার্থীর এই বক্তব্যে উঠে এসেছে ধর্মীয় উৎসব পালনের পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ নিশ্চিত করার প্রত্যাশা। তাঁদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছুটি নির্ধারণ করা হলে শিক্ষার্থীরা আরও স্বস্তির সঙ্গে উৎসব উদ্‌যাপন করতে পারবেন।

ক্যাম্পাসে দুর্গাপূজার আয়োজন চান শিক্ষার্থীরা

উৎসবের আনন্দ পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও দুর্গাপূজা ঘিরে আয়োজনের প্রত্যাশা রয়েছে সনাতন শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তাঁদের মতে, ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতি, বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করতে পারে।

ক্যাম্পাসে দুর্গাপূজার আয়োজনের প্রত্যাশা জানিয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সৌরভ সাহা বলেন,

“কুবির লালমাটির পাহাড়ে কাশফুলের দোল আর নীল আকাশে সাদা মেঘ শরতের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। এ সময় সনাতন শিক্ষার্থীদের মনে জাগে মা দুর্গার আগমনের আনন্দ ও পরিবারের সঙ্গে উৎসব পালনের আকাঙ্ক্ষা। কুবিতে অন্যান্য ধর্মীয় আয়োজন হলেও দুর্গাপূজা হয় না। আমাদের প্রত্যাশা, ক্যাম্পাসে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হোক, যেখানে সব ধর্মের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেবে। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার—এই সম্প্রীতির বন্ধনেই রাঙিয়ে উঠুক কুবি ক্যাম্পাস।”

সৌরভের প্রত্যাশায় উঠে এসেছে ক্যাম্পাসে উৎসবের পরিসর আরও বিস্তৃত করার আকাঙ্ক্ষা। তাঁর মতে, দুর্গাপূজার আয়োজন সব ধর্মের শিক্ষার্থীদের একত্র হওয়ার এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি উদ্‌যাপনের একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সম্প্রীতির বন্ধনে রাঙুক কুবি

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদান ও ডিগ্রি অর্জনের জায়গা নয়; এটি ভিন্ন মত, ধর্ম, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের মানুষের একসঙ্গে বেড়ে ওঠারও ক্ষেত্র। তাই দুর্গাপূজাকে ঘিরে কুবি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় যেমন রয়েছে শৈশবের স্মৃতি ও পরিবারের কাছে ফেরার আকুলতা, তেমনি রয়েছে ধর্মীয় উৎসব পালনের সুযোগ, ক্যাম্পাসে আয়োজন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যাশা।

ঢাকের তালে, শিউলির সুবাসে আর শরতের স্নিগ্ধতায় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা শিক্ষার্থীদের মনে যে আনন্দের রং ছড়ায়, তা যেন উৎসবের কয়েকটি দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার চর্চায় সেই আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সারা বছর। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, ধর্মীয় পরিচয় যার যার হলেও আনন্দ ভাগাভাগি হোক সবার; সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সহাবস্থানের বন্ধনে আরও সুন্দর হয়ে উঠুক কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

Link copied!