মৌলভীবাজার থেকে রাজন হোসেন তৌফিক
প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৭ পিএম
মঙ্গলবার ০১, সেপ্টেম্বর ২০২৬ -- : -- --
ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট
মৌলভীবাজারের ২২ লাখ মানুষের চিকিৎসার মূল আশ্রয়স্থল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রোগীরা শেষ ভরসা হিসেবে ছুটে আসেন এখানে। কিন্তু অবকাঠামো থাকলেও কাঙ্ক্ষিত জনবল, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশের অভাবে হাসপাতালটি আজ নিজেই রোগী। নামে সদর হাসপাতাল, কাজে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির আরেক নাম।
সোমবার ( ৩১ আগস্ট) সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বহিঃবিভাগের সামনে সকাল থেকেই রোগীর দীর্ঘ লাইন। একজন চিকিৎসককে দেখতে ৩-৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ইনডোর ওয়ার্ডগুলোতেও একই অবস্থা। শয্যার তুলনায় রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেশি। তার ওপর চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের তীব্র সংকট। ফলে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন দায়িত্বে থাকা কর্মীরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে সেবা কার্যক্রম সচল রাখতে সরকারিভাবে অনুমোদিত চিকিৎসক পদের সংখ্যা ৮৪ জন। কিন্তু বাস্তবে কর্মরত আছেন মাত্র ৪০ থেকে ৪২ জন। অর্থাৎ প্রয়োজনের অর্ধেক চিকিৎসক দিয়েই চলছে পুরো হাসপাতাল।
শুধু চিকিৎসক নয়, নার্স ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টের সংকটও প্রকট। ১৪ জন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টের অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৯ জন। নার্সের সংকট রয়েছে ২৫ জন। জনবল অর্ধেক হওয়ায় একই চিকিৎসককে একদিনে বহিঃবিভাগ, ইনডোর, ইমার্জেন্সি এবং অপারেশন থিয়েটার সামলাতে হচ্ছে। ফলে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সময় ও মনোযোগ দিয়ে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কমলগঞ্জের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, সকাল ৮টা থেকে লাইনে দাঁড়াইছি। ১২টার দিকে ডাক্তারের কাছে যাইতে পারছি। ১ মিনিট কথা কইয়াই ছাইড়া দিল। ডাক্তার নাই, নার্স নাই। গরিব মানুষ আমরা কই যাইতাম।
জনবল সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিভাগের বেহাল দশা। রোগ নির্ণয় ছাড়া সঠিক চিকিৎসা সম্ভব নয়। কিন্তু এখানে সেই ব্যবস্থাই নেই।
হাসপাতালের এক্স-রে বিভাগটি সপ্তাহে মাত্র ৩ দিন চালু থাকে। বাকি ৪ দিন যন্ত্র নষ্ট থাকা বা জনবল না থাকার কারণে বন্ধ থাকে। জরুরি রোগীকেও ফিরে যেতে হয়। প্যাথলজি বিভাগের অবস্থা আরও খারাপ। রক্ত, প্রস্রাব, ডোপ টেস্টসহ অধিকাংশ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এখানে কম হয়। রিএজেন্ট ও কেমিক্যালের অভাবে প্রায় অর্ধেক পরীক্ষা বন্ধ।
ফলে বাধ্য হয়ে রোগীদের ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা খরচ করে শহরের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দৌড়াতে হচ্ছে। এতে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এক রোগীর স্বজন আব্দুল হান্নান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হাসপাতালে আইয়া টেস্ট করাইতে পারি না। ডাক্তার বাইরের প্রেসক্রিপশন ধরাইয়া দেয়। নামে সরকারি হাসপাতাল, কিন্তু সব কাজ প্রাইভেটে। আমাদের মতো মানুষের পক্ষে এত টাকা খরচ করা সম্ভব না।
মৌলভীবাজার রেমিট্যান্সে সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে পরিচিত। প্রবাসী আয়ে জেলার অর্থনীতি চাঙ্গা। কিন্তু সেই জেলার মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকেই বঞ্চিত।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক উপ-পরিচালক ডা. প্রনয় কান্তি দাস বলেন, আমাদের জনবল সংকট দীর্ঘদিনের। অনুমোদিত ৮৪ জন ডাক্তারের মধ্যে কর্মরত আছেন ৪০ জন। সংকট আছে ৪৪ জন। নার্সের সংকট আছে ২৫ জন। রোগীর চাপ অনেক বেশি। এই চাপ নিয়ে ৪০ জন ডাক্তার দিয়ে সেবা দেওয়া কঠিন।
তিনি আরও বলেন, এক্স-রে মেশিন মাঝেমধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। জনবল না থাকায় প্রতিদিন চালানো যাচ্ছে না। প্যাথলজিতে কিছু টেস্টের কেমিক্যাল শর্টেজ আছে। রোগীর চাপ বেশি থাকায় ডোপ টেস্টেও সমস্যা হচ্ছে। তবে ঔষধে বর্তমানে তেমন সমস্যা নেই। রোগীর চাপ আরও বাড়লে ঔষধ সংকট দেখা দিতে পারে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার চিঠি দিয়েছি। দ্রুত নিয়োগের দাবি জানিয়েছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক বলেন, আমরা ৪০ জন দিয়ে ৮৪ জনের কাজ করছি। সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ডিউটি করতে হয়।
অবকাঠামো আছে, ভবন আছে, যন্ত্রপাতিও কিছু আছে। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল ও তদারকির অভাবে সবই অকার্যকর হয়ে পড়ছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও সুশীল সমাজের নেতারা বলছেন, এটি শুধু মৌলভীবাজারের সমস্যা নয়, এটি ২২ লাখ মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্ন।
তাদের দাবিগুলো হলো:
১. দ্রুত শূন্য থাকা ৪৪টি চিকিৎসক পদে নিয়োগ দিতে হবে।
২. নার্স ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টের সংকট দূর করতে হবে।
৩. এক্স-রে ও প্যাথলজি বিভাগে প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে ৭ দিনই সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ উন্নয়নে আলাদা বাজেট ও মনিটরিং টিম গঠন করতে হবে।
৫. গরিব রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় টেস্ট হাসপাতালেই বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে করার ব্যবস্থা করতে হবে।
একটি জেলার সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল যদি এভাবে ধুঁকতে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? প্রাইভেট হাসপাতালের ব্যয় বহন করার সামর্থ্য সবার নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সংকটের সমাধান নেই। ২২ লাখ মানুষের প্রাণের দায়িত্ব যার কাঁধে, সেই হাসপাতালকে বাঁচাতে হবে। তা না হলে নামে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকলেও, কাজে এটি একটি অচল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।