রবিবার ৩০, আগস্ট ২০২৬

রবিবার ৩০, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --

গল্পের শহরে একদিন

কুবি থেকে আহসান হাবিব রাফি

প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১১ পিএম

ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট

সময় তার নিজস্ব গতিতে বয়ে চলে, কিন্তু আমি যেন কখনোই সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারি না। ফলে নিয়মিতই ক্লাসে সবার পরে উপস্থিত হওয়া আমার এক ধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সেদিনও তার ব্যতিক্রম ছিল না। চুপিচুপি ক্লাসের পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে একটি খালি জায়গা দেখে বসে পড়লাম।

ক্লাসটি ছিল মিলকি স্যারের। তাঁর ক্লাসে অমনোযোগী হওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। তার ওপর বিষয় ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস যে কোন ইতিহাসের বিষয়  বরাবরই আমার ভীষণ প্রিয়। তাই মনোযোগও ছিল অন্য দিনের চেয়ে বেশি।

পড়ানোর মাঝখানে হঠাৎ স্যার বললেন, “তোমাদের জন্য একটা ঘোষণা আছে।” মুহূর্তেই পুরো ক্লাসে কৌতূহল ছড়িয়ে পড়ল। নাজিফা অধীর হয়ে বলল, “স্যার, এখনই বলে দেন না!” স্যার শুধু মুচকি হেসে বললেন, “না, ক্লাসের শেষে বলব।”

এরপর যেন সবার অপেক্ষার প্রহর শুরু হলো। ক্লাস শেষ করে উপস্থিতি নেওয়ার পর স্যার অবশেষে জানালেন, আমাদের এই কোর্সের অংশ হিসেবে একটি ফিল্ড ওয়ার্ক হবে। তিনি ইতোমধ্যে স্থানও ঠিকে করে ফেলেছেন।বিজয় জিজ্ঞেস করল, “কোথায় স্যার?” স্যার উত্তর দিলেন, “সোনারগাঁ... পানাম নগর।”

নামটি শুনেই পুরো ক্লাসে যেন আনন্দের বিস্ফোরণ ঘটল। সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলাম। মনে হচ্ছিল, বহুল প্রতীক্ষিত কোনো সুখবর শুনেছি। স্যার আমাদের শান্ত করে বললেন, আবেদন প্রক্রিয়া প্রায় শেষ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অর্থ বরাদ্দ পেলেই তারিখ নির্ধারণ করা হবে।

সেদিন ক্লাস শেষে আমরা প্রত্যেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম ইতিহাসের শহরে যাওয়ার । কিন্তু স্বপ্নের পথে বাধা আসতে বেশি সময় লাগল না। দুই সপ্তাহ পর আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার, আমরা কবে সোনারগাঁ যাচ্ছি?” স্যারের মুখটা মলিন হয়ে গেল।তিনি বললেন “হয়তো যাওয়া হবে না,”। “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অর্থ ছাড় দিচ্ছে না।”

কথাটা শুনে পুরো ক্লাস যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সবার মুখে নীরবতা। তবে স্যার আমাদের আশ্বস্ত করলেন—
“তোমরা চিন্তা করো না। আমি চেষ্টা করছি।”

এরপর কেটে গেল অনেক মাস। প্রথম ও দ্বিতীয় সেমিস্টার শেষ করে আমরা তৃতীয় সেমিস্টারে উঠলাম। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেও পরিবর্তন এসেছে, আর মিলকি স্যার এখন আমাদের অনুষদের ডিন হয়েছেন।

আমাদের ব্যাচের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে একদিন ছোট্ট একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আমাদের বিভাগের সব শিক্ষক সেখানে  উপস্থিত ছিলেন। খাওয়া-দাওয়া আর আড্ডায় অনুষ্ঠান জমে উঠেছিল।
হঠাৎ স্যার সবাইকে মঞ্চের সামনে ডাকলেন।

“একটা সুখবর আছে,” তিনি বললেন। আমরা একসঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম, “কী সুখবর স্যার?”

তিনি হেসে বললেন,“তোমাদের বাতিল হওয়া ফিল্ড ওয়ার্কের অর্থ আমি ব্যাংক থেকে তুলতে পেরেছি। এই মাসের দ্বিতীয় শনিবার আমরা সোনারগাঁ যাচ্ছি।”কথাটা শোনার পর আনন্দ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল।আমরা সবাই আশা ছেড়েই দিয়ছিলাম যে এই ফিল্ড ওয়ার্কে আর যাওয়া হবে না। 

পরবর্তী এক সপ্তাহ কাটল নানা প্রস্তুতিতে। আমাদের সিআর নাজমুল, বিজয়, মাহাবুবা এবং অন্যরা মিলে খাবার, যাতায়াত ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার একটি পরিকল্পনা তৈরি করে স্যারের কাছে জমা দিলাম। নির্ধারিত হলো—শনিবার সকাল আটটায় ক্যাম্পাস থেকে বাস ছাড়বে।

ফিল্ড ওয়ার্কের আগের দিনটি ছিল শুক্রবার। দিনটি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অন্যতম একটা স্মরণীয় দিন। কারণ, পরদিন আমরা সোনারগাঁ যাচ্ছি—এই আনন্দের পাশাপাশি সেদিন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সিটও পেয়েছিলাম।

তো প্রতিদিনের মতো সেদিন রাতেও শহিদ মীনারে আড্ডা দেওয়ার জন্য গিয়েছিলাম।  শহীদ মিনারে গিয়ে দেখি আমাদের প্রায় পুরো ক্লাস সেখানে আড্ডা দিচ্ছে। বিশেষ করে যারা ক্যাম্পাসের বাইরে থাকে, তাদের উপস্থিতি পরিবেশটাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। মনে হচ্ছিল, মূল ভ্রমণের আগেই যেন আরেকটি ভ্রমণ শুরু হয়ে গেছে।

ওদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে কখন যে এগারোটা বেজে গেছে লক্ষই করিনি এরপর আডডা শেষ করে হলে ফিরে এলাম। কিন্তু উত্তেজনায় ঘুম আসছিল না। নতুন হল, নতুন পরিবেশ, আর পরদিনের ভ্রমণের ভাবনা—সব মিলিয়ে এলোমেলো চিন্তায় কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, মনে নেই।

পরদিন ঘড়ির অ্যালার্মে ঘুম ভাঙল তখন সকাল ছয়টা চল্লিশ। দ্রুত প্রস্তুত হয়ে রুমমেট মাহাবুবকে নিয়ে বাসের সামনে এলাম। অবাক হয়ে দেখলাম, আমরা ছাড়া সবাই প্রায় উপস্থিত।

নির্ধারিত সময়ে বাস ছেড়ে দিল। বাস ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পিকারে বাজতে শুরু করল পরিচিত কিছু  গান। আমরা সবাই কণ্ঠ মিলালাম।নাচ,  গান, হাসি, আড্ডা আর উচ্ছ্বাসে কখন যে গৌরীপুর পৌঁছে গেছি, টেরই পাইনি।

সেখানে নাস্তা শেষে আবার যাত্রা শুরু হলো। ঘণ্টা দেড়েক পর পৌঁছে গেলাম সোনারগাঁ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরে।

জাদুঘরে প্রবেশ করতেই চোখ আটকে গেল শিল্পী জয়নুল আবেদীনের সেই বিখ্যাত চিত্রকর্ম গরুর গাড়ি টানা-র দিকে। এরপর জাদুঘরের ভিতরে প্রবেশ করে  একে একে ঘুরে দেখলাম বিভিন্ন গ্যালারি এবং গ্যালারিতে শোভা পাচ্ছিলো বাংলার প্রাচীন মুদ্রা, অস্ত্রশস্ত্র, অলংকার, পোশাক, লোকজ শিল্পকর্ম, নকশিকাঁথা, জামদানি, বাঁশ-বেত ও মৃৎশিল্পের অসংখ্য নিদর্শন।

সবকিছু দেখে মনে হচ্ছিল, ইতিহাসের পাতাগুলো যেন জীবন্ত হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

এর পর আমরা দুপুরের খাবার শেষে  রওনা দিলাম আমাদের বহু প্রতীক্ষিত গন্তব্য—পানাম নগরের উদ্দেশ্যে।

মাত্র কয়েক মিনিটের পথ। টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করতেই আমার মনে পড়ে গেল পঞ্চম শ্রেণীতে পড়া একটি গল্প—"ঘুরে এলাম পানাম নগর"। আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে বইয়ের পাতায় দেখা সেই শহরেই আমি দাঁড়িয়ে আছি!

দুই পাশের সারিবদ্ধ পুরোনো অট্টালিকা, পরিচ্ছন্ন রাস্তা আর নিস্তব্ধ পরিবেশ মুহূর্তেই আমাদের দুইশো বছর পেছনে নিয়ে গেল।হাঁটতে হাঁটতে স্যার আমাদের ইতিহাস শোনাচ্ছিলেন।

তিনি বললেন,“একসময় সোনারগাঁ ছিল বাংলার রাজধানী এবং পানাম নগর ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র। মসলিন ব্যবসার মাধ্যমে এ অঞ্চল সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। মুঘল ও ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতির সমন্বয়ে নির্মিত এসব ভবন আজও বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরবের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”

আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম,“স্যার, বর্তমানের পরিকল্পিত আবাসিক প্রকল্পগুলোর কিংবা হাউজিং এরিয়ার ধারণা কি এমন নগরায়ণ থেকেই এসেছে?”

স্যার হেসে বললেন,“অবশ্যই। আধুনিক নগর পরিকল্পনার অনেক ধারণার শিকড় রয়েছে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় নগরায়ণের মধ্যে।”কথা শুনতে শুনতে আমি যেন হারিয়ে যাচ্ছিলাম ইতিহাসের ভেতরে। মনে হচ্ছিল, এই অট্টালিকাগুলোর দেয়ালে এখনও লেগে আছে বহু শতাব্দীর গল্প।

ছবি তোলা, ঘোরাঘুরি আর ইতিহাসের গল্প শুনতে শুনতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো, বুঝতেই পারিনি।

ফেরার সময় সূর্য মামা পশ্চিম আকাশে বিদায়ের হাত নাড়তেছিলো। গোধূলির আলোয় আমরা মেঘনা সেতু পার হলাম। সারাদিনের ক্লান্তিতে অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু আমার চোখে তখনও ভাসছিল পানাম নগরের পুরোনো বাড়িগুলো।

রাতে ক্যাম্পাসে ফিরে যখন বাস থেকে নামলাম, তখন মনে হচ্ছিল আমরা শুধু একটি ভ্রমণ শেষ করে ফিরিনি; বরং ইতিহাসের একটি অধ্যায় স্পর্শ করে ফিরেছি।

সোনারগাঁ ও পানাম নগর আমাদের শুধু অতীতের গল্প শোনায়নি, শিখিয়েছে ঐতিহ্যকে ভালোবাসতে, ইতিহাসকে অনুভব করতে এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোকে স্মৃতির পাতায় যত্ন করে ধরে রাখতে।

 

Link copied!