প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:০৭ পিএম
দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে পদক্ষেপ মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দুই দশকের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে কাজ করছে সংস্থাটি। এ লক্ষ্যে রাজধানীতে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো–২০২৬’-এ অংশ নিয়ে নিজেদের প্রকল্পের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি তুলে ধরছে প্রতিষ্ঠানটি।
একই সঙ্গে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) ডোমেস্টিক রুফটপ সোলার (ডিআরএস) কর্মসূচিতে ভবিষ্যতে ডিমান্ড অ্যাগ্রিগেটর (ডিএ) হিসেবে কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে পদক্ষেপ।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইডকল যৌথভাবে এ এক্সপোর আয়োজন করেছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এ এক্সপোর প্রতিপাদ্য ‘ছাদের প্রতিটি ইঞ্চি কাজে লাগান, সৌরবিদ্যুতে আয় বাড়ান’।
জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল ২০২৬–২০৩০ বাস্তবায়নে সহায়তা এবং সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারি নীতি ও প্রণোদনা সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এক্সপোর ৯৩ নম্বর স্টলে পদক্ষেপ সৌর প্যানেল, অফ-গ্রিড ইনভার্টার, ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ প্রদর্শন করছে। প্রদর্শিত সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে ১ দশমিক ৭ কিলোওয়াটের ইনভার্টার, ১২ ভোল্ট ১০০ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ার ও ৬৪ ভোল্ট ১৫০ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ার ব্যাটারি এবং ২০০ ও ৩৫০ ওয়াটের সৌর প্যানেল। এসব সরঞ্জামের মাধ্যমে সংস্থাটির আগে বাস্তবায়িত ও বর্তমানে চলমান সৌরবিদ্যুৎ এবং এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের (ইএসএস) প্রকল্পের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে পদক্ষেপের যাত্রা শুরু ২০০৫ সালে। ইডকল এবং সরকারের গ্রামীণ অবকাঠামো উদ্যোগের সঙ্গে কাজ করে সংস্থাটি প্রত্যন্ত ও বিদ্যুৎসুবিধাবঞ্চিত পরিবারের কাছে সোলার হোম সিস্টেম পৌঁছে দিয়েছে।
পদক্ষেপের নিজস্ব পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে খাগড়াছড়ি, রংপুর, দিনাজপুর, বরিশাল, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, বান্দরবান, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ—এই ১০ জেলায় ৩৩ হাজার ৮২৩টি সোলার হোম সিস্টেম এবং ৩ হাজার ২০টি সৌর সড়কবাতি স্থাপন করেছে সংস্থাটি। সব মিলিয়ে স্থাপিত ব্যবস্থার সংখ্যা ৩৬ হাজার ৮৪৩টি। কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ থাকায় স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর জন্যও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মালিক হওয়া সহজ হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে নিজেদের কার্যক্রমেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়েছে পদক্ষেপ। ২০২২ সালে ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে ২৪ দশমিক ০৯ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। এটি থেকে বছরে আনুমানিক ৩৩ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া শাখা কার্যালয়গুলোতেও সৌরবিদ্যুৎ ও লিথিয়াম ব্যাটারিভিত্তিক এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে শিবপুর ও গৈলায় দুটি বসতবাড়ি, একটি গবাদিপশুর খামার এবং একটি মসজিদ-মাদ্রাসা স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ ও এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম সমন্বিত চারটি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হয়। এগুলোর সম্মিলিত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৮ দশমিক ৮ কিলোওয়াট-পিক।
এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পদক্ষেপ ভবিষ্যতে ইডকলের ডোমেস্টিক রুফটপ সোলার কর্মসূচির ডিমান্ড অ্যাগ্রিগেটর হিসেবে কাজ করার পরিকল্পনা করেছে। এ উদ্যোগের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম শিগগিরই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর আওতায় সংস্থার সদস্য ও সুবিধাভোগীদের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা তুলে ধরা, উপযুক্ত ছাদ ও বিদ্যুতের চাহিদা চিহ্নিত করা এবং প্রযোজ্য নীতিমালা অনুযায়ী কারিগরি সেবা ও অর্থায়নের সুযোগের সঙ্গে সম্ভাব্য গ্রাহকদের যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পদক্ষেপের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ রাকিবুল হাসান বলেন, “জাতীয় সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের লক্ষ্য অর্জনে পরিবার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ববর্তী প্রকল্পের অভিজ্ঞতা এবং বিস্তৃত সদস্যভিত্তিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে আরও বেশি মানুষের কাছে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির সম্ভাবনা তুলে ধরাই এবারের অংশগ্রহণের মূল লক্ষ্য।”
এদিকে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে বিশেষ মূল্য পাওয়ার বিষয়টিও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়।
সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ-সংক্রান্ত বিদ্যুৎ বিভাগের প্রজ্ঞাপন ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫-এর শর্ত পূরণ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে যোগ্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ শুরু করলে গ্রাহকেরা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে পাবেন। ১৮ সেপ্টেম্বরের সরকারি স্পষ্টীকরণ অনুযায়ী, ব্যাটারিসহ ও ব্যাটারি ছাড়া—উভয় ধরনের যোগ্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেই এ সুবিধা প্রযোজ্য।
