প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫১ এএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থী পরিবহনে সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। বাসের ট্রিপ কমে যাওয়া, পর্যাপ্ত জনবল না থাকা এবং তদারকির ঘাটতির পাশাপাশি বাসে ব্যক্তিগত সামগ্রী রেখে আসন ‘দখল’ করে রাখার প্রবণতায় ভোগান্তিতে পড়ছেন নিয়মিত যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীরা। নির্ধারিত সময়ে বাস না পাওয়া, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা এবং বাসে উঠে দাঁড়িয়েও যাতায়াত করতে হচ্ছে তাঁদের। ফলে অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো ক্লাসে উপস্থিত হতে পারছেন না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ৩৭টি বাসের মধ্যে সচল রয়েছে ২৫টি। এসব বাস দিয়ে বিভিন্ন রুটে সীমিতসংখ্যক ট্রিপ পরিচালনা করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বাসের ট্রিপ কমে যাওয়ায় বিশেষ করে দূরের এলাকাগুলো থেকে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বেশি। নির্দিষ্ট সময়ের বাস ধরতে না পারলে অনেককে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বিকল্প পরিবহনে ক্যাম্পাসে আসতে হচ্ছে।
কমেছে ট্রিপ, বেড়েছে ভোগান্তি
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪টি রুটে ৩৯টি বাস দিনে আটটি ট্রিপ পরিচালনা করত। পরবর্তী সময়ে ট্রিপ কমিয়ে চারটিতে নামানো হয়। জ্বালানি সাশ্রয় ও বাজেট ঘাটতির কারণ দেখিয়ে আরও দুটি ট্রিপ বন্ধ করা হয়। পরে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে একটি ট্রিপ চালু করা হলেও আগের তুলনায় পরিবহনসেবা এখনও সীমিত।
বর্তমানে সকাল ৮টা ৫ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয় বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রথম ট্রিপ ছাড়ে। এরপর সকাল ৯টা ১০ মিনিট ও দুপুর ১টা ১০ মিনিটে ট্রিপ রয়েছে। বিকাল ৪টা ১৫ মিনিটে ট্রিপ রয়েছে। বিকাল ৫টার ট্রিপ স্থগিত করা হয়েছে। রাতে লাইব্রেরিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য রাত ১০টা ১০ মিনিটে বাস চলাচল করে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ট্রিপের সময়সূচি ও ক্লাসের সময়ের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় অনেকেই সময়মতো ক্লাসে যেতে পারছেন না। কোনো একটি ট্রিপ মিস করলে পরবর্তী বাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী ওয়াজেদ শিশির অভি বলেন, ‘বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের ট্রিপসংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন সময়মতো ক্লাসে পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে। অনেক সময় বাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। পরিবহনসেবা শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গেও জড়িত।’
আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী ফয়সাল বলেন, ‘আমাকে প্রতিদিন কাটাখালি থেকে এসে ক্লাস করতে হয়। আমার বেশির ভাগ ক্লাস ১১টায়। বাসের সময়সূচির সঙ্গে ক্লাসের সময় মেলে না। বাসের জন্য অপেক্ষা করলে ক্লাস করা সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে আসতে হয়।’
খালি সিট, তবু বসার সুযোগ নেই
পরিবহন সংকটের মধ্যে নতুন করে ভোগান্তি বাড়াচ্ছে বাসে ব্যক্তিগত সামগ্রী রেখে আসন দখল করে রাখার প্রবণতা। বাসে উঠে কোনো আসনে ব্যাগ, বই-খাতা, স্কেল, স্টিকি নোট এমনকি বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক সামগ্রী পড়ে থাকতে দেখা যায়। ওই আসনে বসতে চাইলে বলা হয়, ‘সিট রাখা আছে।’
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেকেই নিজের উপস্থিতি ছাড়াই আগে থেকে এক বা একাধিক আসন দখল করে রাখেন। পরে তাঁরা বাসে উঠে ওই আসনে বসেন। এতে আগে বাসে ওঠা শিক্ষার্থীরাও খালি আসনে বসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
বিশেষ করে দুপুরে ক্যাম্পাস থেকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় যাওয়ার সময় এ প্রবণতা বেশি দেখা যায় বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। ফলে একই বাসে কোথাও খালি আসন পড়ে থাকলেও অন্য শিক্ষার্থীকে দাঁড়িয়ে যেতে হচ্ছে।
এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘নিজে উপস্থিত না থেকেও কেউ যদি সিট ধরে রাখেন, তাহলে আগে বাসে ওঠা শিক্ষার্থীও সেই আসনে বসতে পারেন না। একজনের সুবিধার জন্য অন্য একজনকে দাঁড়িয়ে যেতে হচ্ছে।’
পরিবহন দপ্তরের বক্তব্য
সিট রেখে আসন দখল করে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে রাবি পরিবহন অফিসের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘এটা খুবই একটা বাজে অভ্যাস। সচেতনতা ছাড়া এর সমাধান সম্ভব নয়।’
শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ওপর আমরা পদক্ষেপ নিতে পারি না। শিক্ষার্থীদের সচেতনতাই সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ।’
পরিবহন দপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত সামগ্রী রেখে আসন সংরক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত কোনো ব্যবস্থা নয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে ওঠা একটি অলিখিত চর্চা হিসেবেই এটি চলছে।
নিয়মিত যাত্রীরাই বেশি ভুক্তভোগী
শিক্ষার্থীদের জানান, পরিবহন ব্যবস্থায় বিদ্যমান সংকটের কারণে নিয়মিত যাতায়াতকারীরাই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন। একটি ট্রিপে জায়গা না পেলে পরবর্তী ট্রিপের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। আবার পরবর্তী বাসে উঠেও যদি কোনো শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত সামগ্রী দিয়ে আসন আটকে রাখেন, তাহলে দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে যেতে হয়।
দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে যাতায়াতের কারণে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ক্লান্তিও বাড়ছে। নারী শিক্ষার্থী, অসুস্থ শিক্ষার্থী এবং দিনের বড় সময় ক্লাস-পরীক্ষায় ব্যস্ত থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এ ভোগান্তি আরও বেশি।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, পরিবহনসেবায় সংকটের কারণে একদিকে তাঁদের সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
নিয়ম ও তদারকির দাবি
শিক্ষার্থীদের দাবি, শুধু নতুন বাস বাড়ানো নয়, বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থার সঠিক ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে। রুট ও ক্লাসের সময় বিবেচনায় নিয়ে পর্যাপ্ত ট্রিপ চালু, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ এবং বাসের সময়সূচি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
একই সঙ্গে বাসে ব্যক্তিগত সামগ্রী রেখে আসন সংরক্ষণের বিষয়ে লিখিত নির্দেশনা দেওয়ার দাবি উঠেছে। কোনো শিক্ষার্থী উপস্থিত না থাকলে তাঁর ব্যাগ বা অন্য কোনো সামগ্রী দিয়ে আসন আটকে রাখার সুযোগ না দেওয়ার পাশাপাশি চালক ও সহকারীদের মাধ্যমে বিষয়টি নজরদারির প্রস্তাবও দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সেবামূলক ব্যবস্থা। তাই সীমিত ট্রিপ ও আসনসংকটের মধ্যে কেউ ব্যক্তিগতভাবে আসন দখল করে রাখলে সামগ্রিক পরিবহনসেবায় বৈষম্য তৈরি হয়। প্রশাসনের কার্যকর তদারকি ও স্পষ্ট নীতিমালা ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
