গণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মারুফ হাসান
প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম
বুধবার ১৫, জুলাই ২০২৬ -- : -- --
ফাইল ফটো
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন, প্রান্তিক মানুষের জন্য উচ্চশিক্ষার অঙ্গীকার আর সবুজে ঘেরা ৩২ একর ক্যাম্পাস– এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা গণ বিশ্ববিদ্যালয় আজ ২৮ বছরে পদার্পণ করেছে। শূন্য থেকে শুরু করে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, খেলাধুলা ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানটি এখন হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, স্মৃতি ও সম্ভাবনার ঠিকানা।
এইতো সেদিন জাতীয় স্মৃতিসৌধের কোলঘেঁষে সাভারের নলামে প্রায় ৩২ একর জমির উপরে গড়ে উঠেছিল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর স্বপ্নের গণ বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯৮ সালের ১৪ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টি ২৮ বছরে পড়েছে আজ। শূন্য থেকে শুরু হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এখন রয়েছে বহুতল একাডেমিক ভবন, সুবিশাল খেলার মাঠ, ক্যাফেটেরিয়া, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরির সুবিধা।
শতকেরও কম শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষকের সংখ্যা আড়াইশোর বেশি। পাঁচটি অনুষদের অধীনে মোট ১৭টি বিভাগে পড়াশোনা করছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষার্থী। কলা ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধীনে রয়েছে বাংলা, ইংরেজি, সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম, আইন এবং রাজনীতি ও প্রশাসন বিভাগ। বিজ্ঞান অনুষদে রয়েছে রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, ইইই, সিএসই ও গণিত বিভাগ। স্বাস্থ্য অনুষদের অধীনে রয়েছে বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি, মাইক্রোবায়োলজি ও ফার্মেসি বিভাগ। এছাড়াও বেসরকারি পর্যায়ে প্রথম ভেটেরিনারি শিক্ষায় অবদান রেখে গড়ে উঠা ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সায়েন্সেস অনুষদ এবং কনিষ্ঠতম কৃষি অনুষদ। এছাড়াও নতুন ব্যবসা অনুষদের অধীনে একাউন্টিং, ফিনান্স এন্ড ব্যাংকিং এবং মার্কেটিং তিনটি নতুন বিভাগ চালুর হবে দ্রুতই।
স্বপ্নদ্রষ্টা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও নারীদের কাছে উচ্চশিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই লক্ষ্য থেকেই প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রায় দেড় হাজারের বেশি নারী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। ছয়জন তৃতীয় লিঙ্গের কর্মচারী ও ৩৬ জন নারীসহ শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির রয়েছে অনন্য সাফল্যের গল্প। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক বিজন কুমার শীলের উদ্ভাবিত করোনা শনাক্তকরণ কিট দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এছাড়াও বিভিন্ন জটিল প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, ভার্চ্যুয়াল কাজে সহযোগিতা করাসহ নানা সুবিধাসংবলিত একটি রোবট তৈরি করে আলোচনায় আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থীরা। খেলাধুলাতেও রয়েছে জাতীয় পর্যায়ের সাফল্য। ২০১৯ সালে প্রথম আলো-ইস্পাহানি ফুটবল টুর্নামেন্টের প্রথম আসরে অংশগ্রহণ করেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয়টি। একই টুর্নামেন্টের সর্বশেষ আসরে রানারআপ হওয়ার কৃতিত্বও অর্জন করে। এছাড়াও গত বছর আন্তর্জাতিক কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং-এ স্থান করে নিয়ে নতুন একটি মাইলফলক স্পর্শ করে গণ বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাদামতলায় বসে বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল বলেন, "গণ বিশ্ববিদ্যালয় আমার কাছে শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি আমার দ্বিতীয় পরিবার। এখানকার সবুজ ক্যাম্পাস, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আন্তরিক সম্পর্ক এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে আরও সুন্দর ও স্মরণীয় করে তুলেছে।"
বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভর্তি হয়েছে ফার্মেসি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মিনহাজ নাওয়াজ। তিনি বলেন, "গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমি খুবই ভালো একটি পরিবেশ পেয়েছি। এখানকার শিক্ষকরা আন্তরিক, ক্লাস ও ল্যাবের সুবিধাও অনেক ভালো। আমি বিশ্বাস করি, এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে ভবিষ্যতের জন্য একজন দক্ষ গ্র্যাজুয়েট হিসেবে গড়ে তুলবে।"
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন বলেন, "গণ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মানবকল্যাণের আদর্শকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠিত একটি ভিন্নধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষা, গবেষণা ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে এ বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের লক্ষ্য হলো গবেষণা ও শিক্ষার উৎকর্ষ বজায় রেখে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও এগিয়ে যাওয়া। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী, নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থী এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করাও আমাদের অন্যতম অঙ্গীকার। দক্ষ শিক্ষক, গবেষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গণ বিশ্ববিদ্যালয় ভবিষ্যতেও দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি।"