শুক্রবার ১০, জুলাই ২০২৬

শুক্রবার ১০, জুলাই ২০২৬ -- : -- --

মেস জীবনের ভোগান্তি দুর করবে রাবি শিক্ষার্থীর ‘মুঠোমেস’

রাবি থেকে মো.রেজওয়ান

প্রকাশিত: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৪:২০ পিএম

ছবি।ক্যাম্পাস রিপোর্ট

মেসের মিলের হিসাবের গরমিল, বোর্ডারদের অভিযোগ, মাস শেষে হিসাব মেলানোর চাপ—এসব ঝামেলা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে গিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর একটি স্টার্টআপ গড়ে তুলেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থী। দীর্ঘ কয়েক বছরের প্রচেষ্টা, ব্যর্থতা ও নিরলস পরিশ্রমের পর ‘মুঠোমেস’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মতিউর রহমান মিজান।

শুক্রবার (১০ জুলাই) আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যাপটি গুগল প্লে স্টোরে উন্মুক্ত করা হয়।

মতিউর রহমান জানান, ২০২২ সালে রংপুর সরকারি সিটি কলেজে অধ্যয়নকালে মেস জীবনের শুরুতেই তাকে মিল ম্যানেজারের দায়িত্ব নিতে হয়। মেসের নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব না নিলে ১ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা দিতে হতো। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি উপলব্ধি করেন, মিল পরিচালনা শুধু হিসাব রাখার বিষয় নয়; বরং প্রতিদিনের নানা চাপ ও জটিলতার একটি দায়িত্ব।

তিনি বলেন, এক মাস শেষে হিসাব মিলাতে গিয়ে নিজের পকেট থেকে ৩০ টাকা যোগ করতে হয়েছিল। টাকার অঙ্ক নয়, বরং হিসাবের গরমিলের কারণ খুঁজে না পাওয়াই তাকে নতুন সমাধানের কথা ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।

তার ভাষ্য, একজন মিল ম্যানেজারকে প্রতিদিন বোর্ডারদের মিল চালু-বন্ধ, টাকা জমার হিসাব, ব্যালেন্স পর্যবেক্ষণ, অতিথিদের মিলের ব্যবস্থা এবং মাস শেষে সবার আলাদা হিসাব তৈরি করতে হয়। অন্যদিকে বোর্ডারদেরও ছোটখাটো কাজের জন্য বারবার মিল ম্যানেজারের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে অধিকাংশ মেসেই কেউ স্বেচ্ছায় এ দায়িত্ব নিতে চান না।

এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে প্রথমে বাজারে থাকা বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে দেখেন তিনি। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী কোনো অ্যাপ না পাওয়ায় নিজেই ‘মুঠোমেস’ নামে একটি ওয়েবভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেন। কয়েকবার কাজ শুরু করেও নানা সীমাবদ্ধতায় থেমে যেতে হয়। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আবার মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনিয়র শিক্ষার্থীর সঙ্গে অংশীদারিত্বে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়।

মতিউর রহমান বলেন, “‘মুঠোমেস’ শুধু মিলের হিসাব রাখার অ্যাপ নয়। এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে মেস পরিচালনার প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাজ এক জায়গা থেকেই করা যাবে। প্রাথমিক সংস্করণে মিল ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও ভবিষ্যতে আরও নানা সেবা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।”

স্টার্টআপটি তৈরির পথ সহজ ছিল না বলেও জানান তিনি। দিনের পর দিন রাত চারটা-পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করেছেন। কখনো ফজরের নামাজ পড়ে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে আবার সকালে ক্লাসে অংশ নিয়েছেন। পরীক্ষা, অসুস্থতা, মোবাইল নষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা প্রযুক্তিগত নানা সমস্যাও তাকে থামাতে পারেনি।

তিনি জানান, অ্যাপ তৈরির চেয়ে সেটি প্রকাশের প্রক্রিয়াই ছিল সবচেয়ে কঠিন। গুগল প্লে স্টোরে প্রকাশ, সার্ভার ও ডোমেইন কেনা, বিভিন্ন প্রযুক্তিগত শর্ত পূরণ এবং প্রয়োজনীয় ফি পরিশোধ করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় ও উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়েছে।

মতিউর রহমান বলেন, শুরুতে একজন সিনিয়র শিক্ষার্থী তাকে আর্থিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের আস্থা এবং বন্ধু, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষামূলক ব্যবহার ও মতামত অ্যাপটির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, “‘মুঠোমেস’-কে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে চাই। পাশাপাশি আগে স্থগিত হয়ে যাওয়া একটি এডটেক প্রকল্পও পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য হলো, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবাগুলো একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা।”

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পাননি বলে জানান এই তরুণ উদ্যোক্তা। তবে দেশব্যাপী প্ল্যাটফর্মটি বিস্তৃত করতে বড় পরিসরের বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার বিশ্বাস, প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে ‘মুঠোমেস’ দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর ও টেকসই একটি প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

Link copied!