ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাব্বির আহমেদ
প্রকাশিত: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএম
মঙ্গলবার ০৭, জুলাই ২০২৬ -- : -- --
সংগৃহীত ছবি
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে মাদ্রাসা-কলেজ থেকে ৫০:৫০ অনুপাতে ভর্তিনীতির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ভর্তিশর্তে এ সিদ্ধান্ত থাকলেও গুচ্ছ ভর্তি কার্যক্রমে তা অনুসরণ করা হয়নি। এতে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও বহু মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারেননি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি গুচ্ছ ভর্তি কর্তৃপক্ষের ওপর দায় চাপালেও কেন্দ্রীয় টেকনিক্যাল কমিটি বলছে, নিজস্ব ভর্তিশর্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের। অন্যদিকে একাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদিত ও রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত সিদ্ধান্ত কার্যকর না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল ইসলামও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ৭ ডিসেম্বর বিভাগের একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত এবং একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে মাদ্রাসা ও কলেজ ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০:৫০ অনুপাতে আসন বণ্টনের সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে সাবজেক্টের তালিকায়ও যুক্ত করা হয় এই শর্ত। তবে চলমান ভর্তি কার্যক্রমে ওই নীতির প্রতিফলন দেখা যায়নি। ভর্তির জন্য টাকা জমাদানকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৯০ শতাংশ কলেজ ব্যাকগ্রাউন্ডের বলে জানায় বিভাগ। প্রতিবেদনটি লিখা পর্যন্ত গুচ্ছ ভর্তি পদ্ধতিতে ৭জন মাদ্রাসা ব্যকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থী চয়েস অনুযায়ী এ বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন, তবে তাদের অনেকেরই মাইগ্রেশন অন থাকায় এই বিভাগেই ভর্তি নিশ্চিত নয়।
সংশ্লিষ্ট টেকনিক্যাল কমিটির সদস্যদের মতে আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে এ ইউনিট থেকে ৩২ জন, বি ইউনিট থেকে ৪০ জন এবং সি ইউনিট থেকে ৮ জন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তবে বিজ্ঞপ্তিতে মাদ্রাসা ও কলেজ শিক্ষার্থীদের সমান বণ্টনের কথা বলা হলেও ইউনিটভিত্তিক বণ্টনের স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় হিসাব নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে জানান রেজিস্ট্রার। তবে বিভাগ জানায় এ নিয়ে বিভাগের নিকট কোনো সমাধান চায়নি টেকনিক্যাল কমিটি।
জানা যায়, বিভাগটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত শুধু মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানো হয়। ভর্তি পরীক্ষায় আল-ফিকহ সম্পর্কে আলাদা পরীক্ষাও নেওয়া হতো। পরবর্তীতে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে থেকে মাদ্রাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জন্য ৪০ টি এবং অন্যান্যদের জন্য ৪০ টি আসন নির্ধারণ করা হয়। বিভাগের শিক্ষকদের ভাষ্যমতে, একটি শিক্ষাবর্ষে এ ধারা থাকলেও পরবর্তীতে স্বৈরাচার শাসনামলে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এ বিশেষায়িত বিভাগকে নরমালাইজ করার চেষ্টা করা হয়। এর ভিত্তিতে গুচ্ছ ভর্তিতে এ নিয়ম পরিবর্তন করে মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াই বিভাগটিতে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হয়।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদিত এবং স্বয়ং রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরিত একটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি। এ প্রশ্নে কিছুটা বিব্রত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল ইসলাম বলেন, আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে ৫০:৫০ অনুপাতে মাদ্রাসা ও কলেজ ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থী ভর্তির শর্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে গুচ্ছ ভর্তি (জিএসটি) কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল। তবে জিএসটি কর্তৃপক্ষের দাবি, গুচ্ছ ভর্তি একটি সাধারণ (Generalized) নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হয়। আল-ফিকহ্ বিভাগের মতো বিশেষ শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হলে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত বিভাগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দাবি উঠবে, যা গুচ্ছ পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি বলেন, জিএসটি কর্তৃপক্ষ আরও কয়েকটি কারিগরি জটিলতার কথা উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, অনুমোদিত নীতিতে ‘মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড’ বলতে এসএসসি, এইচএসসি নাকি উভয় পর্যায়ে মাদ্রাসায় অধ্যয়নকে বোঝানো হয়েছে—তা স্পষ্ট নয়। একইভাবে ৫০ শতাংশ আসন এ, বি ও সি ইউনিটে কীভাবে বণ্টন করা হবে, সে বিষয়েও কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। এসব কারণে তারা নীতিটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে।
রেজিস্ট্রার বলেন, আমি প্রথম ধাপের ভর্তি শেষ হওয়ার পর দায়িত্ব নিয়েছি। এখন ৮০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে গেছে। এই অবস্থায় তাদের ভর্তি বাতিল বা নতুন করে পুরো প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা বাস্তবসম্মত নয়। বিষয়টি নিয়ে জিএসটি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছি। এমনকি প্রথম ধাপের ভর্তি শেষে অবশিষ্ট আসনগুলোতে অন্তত নীতিটি বাস্তবায়নের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জিএসটি কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রথম ধাপে ভর্তি সম্পন্ন হওয়ার পর অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা কলেজ ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে সুযোগ দেওয়া হলে নতুন জটিলতা ও বৈষম্যের সৃষ্টি হবে। এছাড়া মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের কোনো শিক্ষার্থী পরবর্তীতে অন্য বিভাগে মাইগ্রেশন করলে নির্ধারিত অনুপাতও আর বজায় থাকবে না।
রেজিস্ট্রার আরও বলেন, বর্তমানে ভর্তি কার্যক্রম শেষ হয়ে যাওয়ায় চলতি শিক্ষাবর্ষে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। তবে ভবিষ্যতে বিষয়টি নিয়ে বিভাগের শিক্ষক ও প্রশাসন আলোচনা করে একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে হবে। প্রয়োজন হলে আল-ফিকহ্ বিভাগকে ডি-ইউনিটের মতো বিশেষায়িত ভর্তি পদ্ধতির আওতায় আনা বা গুচ্ছ ভর্তি কাঠামোর বাইরে পৃথক ভর্তি ব্যবস্থার বিষয়েও আলোচনা করা যেতে পারে।
আল-ফিকহ্ বিভাগে ৫০:৫০ অনুপাত নির্ধারণের যৌক্তিকতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি বিভাগের পাঠ্যক্রম পরিচালনার জন্য আরবি বা মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড অপরিহার্য হয়, তাহলে শুধু অর্ধেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এ শর্ত রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
এবিষয়ে আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাজিমুদ্দিন বলেন, জিএসটি কর্তৃপক্ষ যে শর্ত দিয়েছে সেই শর্ত অনুযায়ী আমি জানি না কিরূপ জটিলতা তৈরি হয়েছে। কতৃপক্ষ এবিষয়ে আমাদের সাথে আলোচনা করেনি। টেকনিক্যাল কমিটি এবিষয়ে ভালো বলতে পারবে।
মাদ্রাসা কলেজ থেকে সমান শিক্ষার্থী কেন নেওয়া হচ্ছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে একাডেমিক কাউন্সিলের সীদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫০:৫০ অনুপাতে ভর্তির সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কোনো প্রশাসনই এটা বাস্তবায়ন করেনি। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পাঠদান ও গ্রহণে জটিলতায় পড়েন। সর্বশেষ বিভাগের অ্যাকাডেমিক কমিটি ২ ধারার গ্রেজুয়েট তৈরির সীদ্ধান্তে উপনিত হয়। মাদ্রাসা ধারার শিক্ষার্থীরা ফিকহে বেশি প্রাধান্য দিবে পাশাপাশি জেনেরাল আইনে অভিজ্ঞ হবে। অপর দিকে কলেজ ধারার শিক্ষার্থীরা আইনের পাশাপাশি ইসলামী আইনে অভিজ্ঞ হবে। ইবি প্রশাসনও সে অনুযায়ী বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।
এবিষয়ে বিভাগটির সিনিয়র অধ্যাপক ড. আবুবকর মোঃ জাকারিয়া মজুমদার বলেন, বিজ্ঞানে পড়তে হলে যেমন বিজ্ঞানের শর্ত লাগে, তেমনি ফিকহ পড়তে হলে ফিকহের শর্ত লাগবে। ফিকহের কিছু বিশেষ শব্দ (টার্ম) আছে যা আরবি না জানা একজন শিক্ষার্থী হুট করে এসে বুঝবে না। এরূপ শিক্ষার্থীদের ভর্তি হওয়ায় বিভাগের উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না। এই ষড়যন্ত্রের পেছনে হাত ছিল সাবেক উপাচার্য ড. রাশিদ আসকারী ও উপ-উপাচার্য ড. শাহিনুর রহমানদের। তারা জোর করে আমাদের উপর এটা চাপিয়ে দেয়। এখন শিক্ষার্থীরা নিজেরা ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না, আর আমরাও পাঠদান করতে গিয়ে অসুবিধায় পড়ছি।
অন্যদিকে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার কেন্দ্রীয় টেকনিক্যাল কমিটির দায়িত্বে থাকা ইউএফটিবির সহকারী অধ্যাপক রুবেল শেখ বলেন, এ বিষয়ে সম্পর্কে আমি অবগত নই। এ ধরনের নীতিগত বা শর্তসাপেক্ষ ভর্তি সংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই ভালো জানেন। গুচ্ছ ভর্তি ব্যবস্থার আওতাভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত নিজেদের বিভাগভিত্তিক বিশেষ শর্ত ও নীতিমালার বিষয়গুলো স্বতন্ত্রভাবে নির্ধারণ ও সমাধান করে থাকেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মতিনুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে জানার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে অফিসকে তথ্য দিতে বলেছিলাম। কিন্তু এখনো তারা আমাকে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময়ে এ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছিল। আমি প্রায় এক মাস হলো যোগদান করেছি, এর মধ্যেও হাতেগোনা কয়েকটি কার্যদিবস পেয়েছি তাই চলমান প্রত্রিয়ায় কিছু করার সুযোগ ছিল না। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিষয়গুলো আমি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবো।
উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্দেশে গঠিত ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি কমিটি’র চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ধারা ১.২.১ এবং ৫.১৪ তে ভর্তির ক্ষেত্রে জেনারেল ও মাদ্রাসা থেকে সমান সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির নিয়ম বেধে দেওয়া হয়। ১৯৮৮ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীর ৫০% মাদ্রাসা থেকে নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। দুই ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ১০০ নম্বরের ইংরেজি অথবা আরবি ও ইসলামিয়াতও আবশ্যিক ছিল। বর্তমানে এই ভারসাম্য বিলুপ্ত। ধর্মতত্ত্ব অনুষদেও নেই জেনারেল শিক্ষার্থীদের ৫০% ভারসাম্য নীতি। শুধুমাত্র আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল’ বিভাগে তা পুনরায় কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও চলমান ভর্তি কার্যক্রমে নীতিটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।