প্রকাশিত: ০৫ জুলাই ২০২৬, ১১:১৩ পিএম
ঢাকা থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে মানিকগঞ্জের গোলোরায় অবস্থিত আকিজ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড (এটিএমএল) টেকসই শিল্প উৎপাদনের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পানি পুনর্ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিক উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ সরকারের ন্যাশনাল গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড ২০২৫ অর্জন করেছে।
১৯৯৮ সালে আকিজ গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করা এটিএমএল বর্তমানে ৫৫ একরজুড়ে বিস্তৃত সমন্বিত শিল্প ক্যাম্পাসে সুতা উৎপাদন, বয়ন, রঞ্জন, ফিনিশিং এবং রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রায় সাত হাজার কর্মীর এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন ফ্যাশন ব্র্যান্ডের জন্য পণ্য উৎপাদন করে।
প্রতিষ্ঠানটির টেকসই উদ্যোগের অন্যতম ভিত্তি সৌরবিদ্যুৎ। কারখানার ছাদজুড়ে স্থাপিত ১০ মেগাওয়াট-পিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ইতোমধ্যে বিদ্যুতের উল্লেখযোগ্য অংশের চাহিদা পূরণ করছে। ২০২৬ সালের মধ্যে এ সক্ষমতা ১৫ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এখন পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ২ কোটি ১৫ লাখ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং প্রায় ১৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা সাশ্রয় করেছে।
জ্বালানি ব্যবস্থাপনাতেও এনেছে বড় পরিবর্তন। ধানের তুষ, পাটের লাঠি, ভুট্টার কাব, সরিষার ডালপালা, করাতকলের কাঠের টুকরা ও অন্যান্য কৃষি বর্জ্য ব্যবহার করে পরিচালিত ১৪ টন-প্রতি-ঘণ্টা সক্ষমতার বায়োমাস বয়লার জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে। পাশাপাশি বয়লারের ধোঁয়ায় থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইড বর্জ্য শোধনাগারে ব্যবহার করে পিএইচ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সালফিউরিক অ্যাসিডের ব্যবহার প্রায় ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে, যা দেশের শিল্পখাতে একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎপাদনেও এগিয়ে রয়েছে এটিএমএল। প্রতিদিন ৩০ মেট্রিক টন পুনর্ব্যবহারযোগ্য সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা সম্পন্ন ইউনিটে ব্যবহৃত পোশাক থেকে নতুন ফাইবার তৈরি করা হয়। এখান থেকে উৎপাদিত কাপড়ে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য তুলা এবং ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত পুনর্ব্যবহারযোগ্য পলিয়েস্টার ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে কাঁচামাল, পানি ও জ্বালানির ব্যবহার কমার পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পাচ্ছে।
পানি ব্যবস্থাপনায়ও প্রতিষ্ঠানটি অনুসরণ করছে পরিবেশবান্ধব নীতি। দুটি জৈবিক বর্জ্য শোধনাগারে প্রতিদিন কয়েক হাজার ঘনমিটার বর্জ্য পানি পরিশোধন করা হয়। পরিশোধিত পানির একটি অংশ কারখানার বিভিন্ন কাজে পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে এ হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বায়োগ্যাস উৎপাদন এবং বর্জ্য পুনঃব্যবহারের মতো উদ্যোগও বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
শুধু পরিবেশ নয়, সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কর্মীদের জন্য আবাসন সুবিধা, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং অসহায় মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার স্বীকৃতি হিসেবে এটিএমএল ইতোমধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক পুরস্কার ও সনদ অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড ২০২৫, ক্লিন বাই ডিজাইন সার্টিফিকেট অব অ্যাচিভমেন্ট, ওয়াসাটেক্স এক্সেলেন্স সার্টিফিকেটসহ জিআরএস, আরসিএস, জিওটিএস, আইএসও ১৪০০১ এবং জেডডিএইচসি-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সনদ।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রতি কেজি কাপড় উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ ৫.৬ কেজি থেকে কমে ২.২ কেজিতে নেমে এসেছে। একই সময়ে প্রতি কেজি উৎপাদনে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ১১৭ লিটার থেকে কমে ৭১ দশমিক ৯৯ লিটারে পৌঁছেছে। আগামী কয়েক বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, পানি পুনর্ব্যবহার এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ আরও কমানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে আকিজ টেক্সটাইল মিলস।
