প্রকাশিত: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:১০ পিএম
প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এশিয়া প্যাসিফিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অলিম্পিয়াডে ইতিহাস গড়ে তিনটি স্বর্ণপদক জিতেছে বাংলাদেশ। শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর পান্থপথে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল একাডেমিতে এই সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ দলকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডাটাসফট সিস্টেমের প্রেসিডেন্ট এম মনজুর মাহমুদ, মিলিয়ন এক্স বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আনিস রহমান, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের চেয়ারম্যান মো. সারোয়ার হোসেন মোল্লাহ, বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের প্রেসিডেন্ট মুনির হাসান, বাংলাদেশ দলের কোচ ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এসোসিয়েট প্রফেসর মো. আজম খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিকস অ্যান্ড মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক লাফিফা জামাল এবং বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার। এছাড়া মাইক্রসফটের এআই লিড সাদিদ হাসান ও ড. এহসানুল হক ভিডিও বার্তায় পদকজয়ীদের উৎসাহ প্রদান করেন।
এ সময় ডাটাসফট সিস্টেমের প্রেসিডেন্ট এম মনজুর মাহমুদ বিজয়ীদের উদ্দেশে বলেন, "সব সময় বড় স্বপ্ন দেখবে। জীবন একটি বড চ্যালেঞ্জ। এডাপ্টিবিলিটি হচ্ছে সামনের দিনের গেম চেঞ্জার। যারা তাড়াতাড়ি শিখতে পারে, যুগের সাথে সাথে নিজেদেরকে এডাপ্ট করতে পারবে তাঁরা হবে সামনের দিনের আমাদের ভবিষ্যৎ।"
মিলিয়ন এক্স বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আনিস রহমান বলেন, "তোমরা হচ্ছে সামনের দিনের ফিউচার। তোমরা এতো ভাল পারফর্মেন্স করছো যে এটা অবিশ্বাস্য। তোমরা যদি এরকম করে যেতে পারো তাহলে ভবিষ্যৎ তোমাদের মনে রাখবে।"
বাংলাদেশ দলের কোচ ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এসোসিয়েট প্রফেসর ড. মো. আজম খান বলেন, "বাংলাদেশ দলের এই ফলাফলের পিছনের দেশে বিদেশের অনেক মেন্টরের অবদান রয়েছে। তাদের এই ডেডিকেশনের ফলে বাংলাদেশ দলের এই ফলাফল সম্ভব হয়েছে। তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।"
প্রথম আসরেই চীন, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান ও ইরানের মতো প্রযুক্তিতে শীর্ষস্থানীয় দেশসহ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ১৮টি দেশের ১২৯ জন প্রতিযোগীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বাংলাদেশের তিন শিক্ষার্থী স্বর্ণপদক অর্জন করে। প্রতিযোগিতায় মোট ১০টি স্বর্ণপদক দেওয়া হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ একাই জেতে তিনটি স্বর্ণপদক, যা কোনো দেশের জন্য সর্বোচ্চ স্বর্ণপদক জয়ের রেকর্ড। এই আসরে অন্য কোনো দেশ দুটির বেশি স্বর্ণপদক অর্জন করতে পারেনি।
বাংলাদেশের হয়ে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন হোমনা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী লাবিব শাহরিয়ার, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সাইদুজ্জামান আরাফ এবং নটর ডেম কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ত্রিদিব রায়। আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত র্যাংকিংয়ে তাঁরা যথাক্রমে চতুর্থ, পঞ্চম ও নবম স্থান অর্জন করেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্বর্ণপদকজয়ী তিন শিক্ষার্থীর পাশাপাশি সম্মানজনক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অন্য প্রতিযোগী, দলের কোচ এবং মেন্টরদেরও সম্মাননা জানানো হয়।
সংবর্ধনা পাওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে স্বর্ণপদকজয়ী লাবিব শাহরিয়ার বলে, "এই অলিম্পিয়াড চলাকালীন আমার জীবনে বেশ কিছু সমস্যা চলছিল। কিন্তু দেশের প্রতিনিধিত্ব করার ব্যাপারে আমি কোনো আপশ করিনি। সবার আগে ছিল আমার দেশের প্রতিনিধিত্ব। দেশের জন্য এই সাফল্য আনতে পেরে আমি গর্বিত।"
স্বর্ণপদকজয়ী মো. সাইদুজ্জামান আরাফ বলে, "বাংলাদেশ পারে বাংলাদেশ করে, বাংলাদেশ করবে। লেগে থাকলে কন কিছুই অসম্ভব ন্য। সেটাই আমরা করে দেখানো চেষ্টা করে গেছি। এই ফলাফল সামনের দিনে আমাদেরকে আরও ভাল করার জন্য উৎসাহ দিবে।"
স্বর্ণপদকজয়ী ত্রিদিব রায় আর্য এর মা বলে, "আমারদের সোনার ছেলেরা বিশ্বের অনেকগুলো দেশের সাথে প্রতিযোগিতা করে এই সাফল্য নিয়ে এসেছে। এটা শুধু অভিভাবক হিসেবে আমাদেরকে না পুরো দেশকে গর্বিত করেছে।"
অনুষ্ঠানের শুরুতে এশিয়া প্যাসিফিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের সাফল্য নিয়ে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের প্রেসিডেন্ট মুনির হাসান। তিনি বলেন, "তিন বছর আগে আমরা এআই অলিম্পিয়াডের কার্যক্রম শুরু করি। এ বছর প্রথম এশিয়া প্যাসিফিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়ে আমাদের ছেলেরা রেকর্ড গড়েছে। তাদের সবাইকে অভিনন্দন।"
প্রসঙ্গত, গত এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ এআই অলিম্পিয়াডের কার্যক্রম শুরু হয়। মে মাসের প্রথমার্ধে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগে আঞ্চলিক পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৬ মে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজিতে জাতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। পরে ২০ থেকে ২৩ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত জাতীয় সিলেকশন ক্যাম্পের মূল্যায়নের ভিত্তিতে বাংলাদেশ দল নির্বাচন করা হয়।
গত ১৩ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট থেকে অনলাইনে ভিডিও প্রক্টরিং ও স্ক্রিন রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় বাংলাদেশ দলের আটজন শিক্ষার্থী। ছয় ঘণ্টাব্যাপী প্রতিযোগিতায় বোরিয়াম প্ল্যাটফর্মে চারটি পৃথক মেশিন লার্নিং সমস্যার সমাধান করেন প্রতিযোগীরা।
প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলাদেশ এআই অলিম্পিয়াডের আয়োজন করে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক। প্লাটিনাম স্পন্সর ও জাতীয় পর্বের হোস্ট ছিল বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি এবং পাওয়ার্ড বাই পার্টনার ছিল রিভ চ্যাট।
গোল্ড স্পন্সর হিসেবে ছিল ব্রেইন স্টেশন ২৩। সিলভার স্পন্সর ছিল মিলিয়ন এক্স বাংলাদেশ ও ক্রিয়েটিভ আইটি। ব্রোঞ্জ স্পন্সর ছিল বিটনা। নলেজ পার্টনার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট। ম্যাগাজিন পার্টনার ছিল কিশোর আলো ও বিজ্ঞানচিন্তা। টিভি পার্টনার ছিল দীপ্ত টিভি। অন্যান্য পার্টনার হিসেবে ছিল বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি, রকমারি ডট কম এবং জাদু পিসি।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক। সহযোগিতায় ছিল ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ।
