বুধবার ২৪, জুন ২০২৬

বুধবার ২৪, জুন ২০২৬ -- : -- --

জুলাই শহীদদের বিচার দাবিতে সংসদে আবেগঘন বক্তব্য রোকেয়া বেগমের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩ জুন ২০২৬, ১১:৪৪ পিএম

জুলাই শহীদদের বিচার দাবিতে সংসদে আবেগঘন বক্তব্য রোকেয়া বেগমের

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে নিহতদের বিচার দ্রুত দৃশ্যমান না হলে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান সম্ভব নয় বলে জাতীয় সংসদে মন্তব্য করেছেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম। মঙ্গলবার বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি শহীদ পরিবারগুলোর বিচারপ্রাপ্তির দাবিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।

সংসদে দেওয়া আবেগঘন বক্তব্যে নিজের ছেলে জাবির ইব্রাহিমের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘৫ আগস্ট আমার ছোট্ট জাবির ইব্রাহিম গুলিবিদ্ধ হয় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শাহাদাত বরণ করে। আমি যখন ওকে দেখছিলাম, তখন দেখছিলাম ও সাদা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। একটা ফোঁটা রক্তও ওর ভেতরে ছিল না। পুরো রক্ত এই জমিনে পড়ে গিয়েছিল।’ 

তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদ পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়মিত সংসদে উপস্থাপনের দাবি জানান তিনি।

রোকেয়া বেগমের ভাষায়, ‘একজন বাবা অথবা মা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার আগে যেটা চায়, সেটা হলো তার সন্তানের হত্যার বিচার। দৃশ্যমান বিচার ছাড়া কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলুপ্তি সম্ভব নয়।’

বাজেটে শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মাসিক ভাতা, আবাসন সহায়তা ও চিকিৎসার জন্য ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে তাঁর মতে, আর্থিক সহায়তার চেয়েও বিচার নিশ্চিত করাই পরিবারগুলোর মূল প্রত্যাশা।

সংসদে তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে এখন পর্যন্ত ৮০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র সাতটির রায় হয়েছে এবং ২২টির সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এই তথ্য তুলে ধরে বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির সমালোচনা করেন তিনি।

এ ছাড়া, এখনো বহু শহীদের নাম সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া নিয়েও উদ্বেগ জানান রোকেয়া বেগম। তাঁর দাবি, আরও অন্তত ৫০ জন শহীদের নাম এখনো তালিকাভুক্ত হয়নি। আহত যোদ্ধাদের শ্রেণিবিন্যাস নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, অনেক গুরুতর আহত ব্যক্তিকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়নি।

জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের প্রশংসা করে তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ৮৩১টি শহীদ পরিবার ও ৬২৭ জন আহত যোদ্ধাকে ১২০ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে। তবে তিন মাস ধরে ফাউন্ডেশনের কর্মীরা বেতন ও ঈদ বোনাস না পাওয়ার বিষয়টিও সংসদে তুলে ধরেন।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি তিনটি দাবি জানান—ফাউন্ডেশনের জন্য পৃথক আর্থিক কোডের মাধ্যমে বরাদ্দ নিশ্চিত করা, প্রতিশ্রুত বাকি ২৬৩ কোটি টাকা দ্রুত ছাড় করা এবং ফাউন্ডেশনটিকে সরকারি সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

রোকেয়া বেগমের বক্তব্যের পর আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘যিনি শহীদ মাতা বক্তৃতা দিয়েছেন, তাঁর প্রতিটি বক্তব্যই আমাদের চেতনায়, আমাদের রক্তে, আমাদের বিপ্লবে, আমাদের সংগ্রামের প্রেরণার মূল চেতনা।’

জুলাই যোদ্ধাদের রাজনৈতিক সুরক্ষার বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটি আইন একটি রাজনৈতিক দলিল। প্রতিটি আইন সরকারের একটি পাবলিক পলিসি। সরকারের পক্ষ থেকে যে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব, সেটা আইনি কাঠামোর মধ্যেই সম্ভব।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমার সরকার, আমাদের সরকার, বিএনপির সরকার, জুলাই যোদ্ধাদের সরকার, জুলাই চেতনার সরকার সেই আইনি কাঠামোর মধ্যেই জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা দিয়েছে এবং সেটাই রাজনৈতিক সুরক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে।’

Link copied!