সোমবার ২২, জুন ২০২৬

সোমবার ২২, জুন ২০২৬ -- : -- --

খুলনার পুনর্বাসন কেন্দ্রে ১৯ দিনেও খাবার খায়নি খান জাহান আলীর বিরল প্রজাতির কুমির

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২ জুন ২০২৬, ০৪:২২ পিএম

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজারের দিঘি থেকে উদ্ধার করা মিঠাপানির শতবর্ষী কুমিরটি খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে ১৯ দিন পার করলেও এখনো কোনো খাবার গ্রহণ করেনি। মাছ, মাংস ও জীবন্ত হাঁস দেওয়া হলেও প্রায় ৪৫ বছর বয়সী মাদী কুমিরটি খাবারে আগ্রহ দেখায়নি।

গত ৩ জুন বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের অনুরোধে বন বিভাগের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল দিঘি থেকে কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনায় নিয়ে আসে। বর্তমানে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রাণীটির শারীরিক অবস্থা ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

বন বিভাগ জানিয়েছে, দীর্ঘদিন খাবার না খেলেও কুমিরটির শরীরে থাকা অতিরিক্ত চর্বির কারণে আপাতত বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়নি। তবে নতুন পরিবেশ ও খাঁচাবদ্ধ অবস্থার কারণে প্রাণীটি মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত ১ জুন মাজারের দিঘিতে গোসল করতে নামা সাত বছর বয়সী এক শিশুকে কুমিরটি টেনে নিয়ে গেলে শিশুটির মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসনের উদ্যোগে কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

পুনর্বাসন কেন্দ্রে কুমিরটির স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস ফিরিয়ে আনতে ছোট-বড় মাছ, মুরগি এবং শিকারের প্রবণতা ফেরাতে জীবন্ত হাঁসও দেওয়া হয়। তবে কোনো খাবারই গ্রহণ করেনি প্রাণীটি।

খুলনা কার্যালয়ের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, 'সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী হিসেবে কুমিরের মেটাবলিজম রেট (বিপাক প্রক্রিয়া) অত্যন্ত ধীর। ফলে এরা দীর্ঘ সময় না খেয়ে অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে। বিশেষ করে এই কুমিরটি মাজারের দিঘিতে থাকা অবস্থায় মানুষের দেওয়া অতিরিক্ত খাবার খেয়ে অত্যন্ত চর্বিবহুল ও স্থূল হয়ে পড়েছে। ৪৫ শত কেজি ওজনের এই কুমিরটির শরীরে যে পরিমাণ ফ্যাট বা চর্বি জমা আছে, তাতে এটি এক থেকে দুই মাস অনায়াসে না খেয়ে থাকতে পারবে।'

তিনি আরো জানান, কুমিরটি একটি মুরগিকে ধরে কামড় দিলেও শেষ পর্যন্ত সেটি খায়নি এবং মুখ থেকে ফেলে দেয়।

অতিরিক্ত চর্বির কারণে স্থলভাগে চলাচলে ধীরগতি দেখা গেলেও পানিতে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছে কুমিরটি। পুনর্বাসন কেন্দ্রের কর্মীরা জানিয়েছেন, প্রাণীটির মধ্যে মুক্ত পরিবেশে ফিরে যাওয়ার প্রবল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। অনেক সময় এটি পানির বাইরে উঠে খাঁচার গেটে ধাক্কা দিচ্ছে।

সুন্দরবনে কুমিরটিকে অবমুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে বন বিভাগ জানিয়েছে, মিঠাপানির এই কুমিরকে সুন্দরবনের লবণাক্ত পানিতে ছেড়ে দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব নয়। কারণ সুন্দরবনে মূলত লোনাপানির কুমিরের বসবাস।

মাজারের দিঘিতে পুনরায় কুমিরটি ফেরানো হবে কি না, তা নির্ভর করছে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। মাজার কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে পারলে বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

ডিএফও নির্মল কুমার পাল বলেন, 'মাজার কর্তৃপক্ষ যদি কুমির এবং সেখানে আসা হাজারো ভক্ত-দর্শনার্থী উভয় পক্ষের শতভাগ নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করতে পারে, তবেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেটিকে ফেরত দেওয়া হতে পারে। কারণ কুমিরটি দিঘির পাড় গলে মাঝেমধ্যেই লোকালয়ে বা রাস্তায় চলে যেত, যা মানুষ ও প্রাণী উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।'

তিনি বলেন, 'মাজার কর্তৃপক্ষ যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তবে আমরা বিষয়টি সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানাব এবং পরবর্তী স্থায়ী পুনর্বাসনের পদক্ষেপ নেব।'

বন বিভাগ জানিয়েছে, কুমিরটির আচরণ স্বাভাবিক করতে আরও অন্তত এক মাস খুলনার পুনর্বাসন কেন্দ্রেই রাখা হবে।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) ২০০০ সালে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক মুক্ত জলাশয় থেকে মিঠাপানির কুমিরকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। বাগেরহাটের এই মাজারের দিঘি ছিল দেশের মিঠাপানির কুমিরের অন্যতম শেষ আশ্রয়স্থল।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে কয়েকটি মিঠাপানির কুমির উদ্ধার হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা এটিকে জীববৈচিত্র্যের পুনরুজ্জীবনের ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন।

খান জাহান আলীর দিঘির এই কুমিরটির ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে মাজারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বন বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।

Link copied!