বৃহস্পতিবার ০৭, মে ২০২৬

বৃহস্পতিবার ০৭, মে ২০২৬ -- : -- --

বুটেক্সের অটোমেশন প্রকল্প দুই বছরেও ঝুলে, সমন্বয় সংকটে ডিজিটাল ক্যাম্পাস অনিশ্চিত

সানজানা শওকত,বুটেক্স প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৭ মে ২০২৬, ০২:১১ পিএম

প্রতীকী ছবি।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত অটোমেশন প্রকল্প দুই বছর পেরিয়ে গেলেও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। প্রশাসনিক জটিলতা, শিক্ষক, আইসিটি সেল এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক অসহযোগিতা ও দ্বন্দ্বে প্রায় ৫ কোটি টাকার এই প্রকল্প এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ফলে ডিজিটাল ক্যাম্পাস গঠনের স্বপ্ন কার্যত থমকে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে ‘প্রোকিউরমেন্ট অব মেশিনারিজ অব নেটওয়ার্ক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ল্যাব’ অংশের আওতায় ইন্টিগ্রেটেড ইউনিভার্সিটি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার (আইইউএমএস) চালুর মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও এখনো এটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়নি।

এ বিষয়ে শিক্ষক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। শিক্ষকরা বলছেন সফটওয়্যারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো অসম্পূর্ণ, অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দাবি করছে কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এই ভিন্নমুখী অবস্থানের কারণে প্রকল্পটি গ্রহণ প্রক্রিয়া আটকে আছে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) গত ৩১ মার্চ এক চিঠিতে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। চিঠিতে বলা হয়, যতটুকু কাজ সম্পন্ন হয়েছে তা দ্রুত বুঝে নিয়ে ঠিকাদারের বিল পরিশোধ এবং এক মাসের মধ্যে প্রজেক্ট কমপ্লিটেন্স রিপোর্ট (পিসিআর) জমা দিতে হবে। তবে এরপর একাধিক বৈঠক হলেও প্রকল্পের টেকনিক্যাল কমিটি এখনো একমত হতে পারেনি।

টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. মো. সাইদুজ্জামান বলেন, “কাজ শেষ না হতেই আমাদের ওপর বুঝে নেওয়ার চাপ দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো (রেজিস্ট্রার, অ্যাকাউন্টস) কেউ ফর্মে লেখেনি যে কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সবাই ‘চলমান’ বা ‘অসন্তুষ্ট’ মন্তব্য করেছে। তাহলে আমরা কীভাবে বুঝে নেব। তাছাড়া ২০২৪ সালের প্রজেক্ট এখন বুঝে নিতে হলে ব্যাকডেটে সই করতে হবে, যা ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।”

প্রকল্পের আওতায় আইইউএমএস সফটওয়্যার ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভারে সমন্বিত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গত তিনবার এমবিএ এবং একবার এমএসসি ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে এবং ৫০তম ব্যাচ দিয়ে সিস্টেম শুরু করা হয়। তবে শিক্ষক ও প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে ওই ব্যাচের লেভেল–১ টার্ম–২ এর ফলাফল সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া ৫১তম ব্যাচের লেভেল–১ টার্ম–২ এর ক্লাস প্রায় শেষ হলেও বহু বিভাগ এখনো সিস্টেমে তথ্য আপলোড করেনি। ফলে হাজিরা, ক্লাস ও পরীক্ষার নম্বর অনলাইন সিস্টেমে যুক্ত হচ্ছে না।

প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক হোসনে আরা বেগম বলেন, "অটোমেশন একটি চলমান প্রক্রিয়া। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কয়েক দশকের প্রচেষ্টায়ও এখনো পুরোপুরি ডিজিটালাইজড হতে পারেনি। সেখানে বুটেক্সের শিক্ষক এবং কর্মকর্তারা প্রথম দিনেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সিস্টেম চাচ্ছে যা আসলে পাওয়া কঠিন।"

অন্যদিকে একাধিক সূত্রের অভিযোগ, আইসিটি সেলের সীমিত জনবল এবং অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসছে না। তবে আইসিটি সেলের কর্মকর্তা মো. আসিফুর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, “এগুলো ভুয়া কথা, চাপ সৃষ্টি করার জন্য বলা হচ্ছে অটোমেশন কার্যক্রমে আমাদের আইসিটি সেলের ভূমিকা খুবই সীমিত। আমাদের কাজ মূলত কোনো ভুল-ত্রুটি আছে কি না তা যাচাই করা।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা দেখতে পেয়েছি, লেভেল-১ টার্ম-১ এর ফলাফল লেভেল-১ টার্ম-২তেও একইভাবে দেখাচ্ছে। একই সমস্যা লেভেল-২ টার্ম-১ এও পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এখানে বড় ধরনের ত্রুটি রয়েছে। এ অবস্থায় এটি গ্রহণ করা সম্ভব নয়। যারা কাজটি করছেন, তারা নতুনভাবে সিস্টেম তৈরি করছেন। নতুনভাবে কোনো সিস্টেম তৈরি করলে শুরুতে কিছু ভুল-ত্রুটি থাকা স্বাভাবিক।”

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, অটোমেশন চালু হলে শিক্ষকদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা বাড়বে। হাজিরার নম্বর সফটওয়্যারেই দিতে হবে এবং এসেসমেন্টের নম্বর টার্ম ফাইনালের আগেই জমা দিতে হবে। এতে অনেক শিক্ষক অনীহা প্রকাশ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. এ টি এম ফয়েজ আহমেদ বলেন, ”এই অটোমেশন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় পেয়েও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের কাজ সম্পূর্ণ শেষে করতে পারেনি। তারা এই প্রকল্পের একটা মডিউলও সম্পন্ন করে পারেনি। এই অসম্পূর্ণ সফটওয়্যার গ্রহণ করা যায় না। শিক্ষার্থীরা তাদের হলের সিট, রুম নম্বর, দেনা পাওনা ইত্যাদি যাবতীয় তথ্য দেখতে পারছে না এই সিস্টেমের মাধ্যমে। একটা প্রকল্প শেষ না হলে ইউজিসি থেকে অন্য প্রকল্প পাওয়াটা যথেষ্ট কঠিন। অসম্পূর্ণ এই প্রকল্পটির কারণে বর্তমান প্রশাসনকে অন্য নতুন প্রকল্পের কাজ পেতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আর সেমিস্টারে শিক্ষার্থীদের এসেসমেন্টের নম্বর কখন দিতে হবে সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিময় অনুযায়ী নির্ধারণ করবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। যদি এই সময় বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে সেক্ষেত্রে বিভাগীয় প্রধানের সাথে আলোচনা করে সময় নির্ধারণ করতে পারেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক।”

পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. শেখ মো. মামুন কবীর বলেন, প্রকল্পটি দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন এখনো প্রকল্প বুঝে নেওয়া হচ্ছে না বা সহযোগিতা করা হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের অগ্রগতি অনুযায়ী আংশিক কাজ গ্রহণ করে বাকি অর্থ সরকারে ফেরত দেওয়ার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

এদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাইপারট্যাগ সল্যুশনস জানিয়েছে, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তাদের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্প বাতিলের সুযোগ নেই এবং কয়েকটি বিভাগ ইতিমধ্যে সিস্টেম ব্যবহার করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়, “চুক্তি অনুযায়ী প্রজেক্ট বাতিল করার কোনো সুযোগ নেই। ওয়েবসাইট বা সফটওয়্যার যদি কিছুই না হয়ে থাকে, তবে মাস্টার্সসহ কয়েকটি বিভাগের রেজাল্ট এই সিস্টেম দিয়ে কীভাবে পাবলিশ হলো। আমরা পরবর্তী তিন বছর টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ আছি। চেক অ্যান্ড এরর-এর মাধ্যমে এটি নিয়মিত আপডেট করতে হবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ শুরুতেই বলছে কিছুই হয়নি।”

বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. জুলহাস উদ্দিন বলেন, প্রকল্প চলাকালে তিনি দায়িত্বে ছিলেন না। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রকল্প বুঝে নেওয়া ও পিসিআর জমা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

তবে প্রশাসন, শিক্ষক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের টানাপোড়েনে শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ডিজিটাল ক্যাম্পাসের স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৫০তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন,“আমাদের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে অনেক সময় লাগে এবং নম্বর ও ফলাফল নিয়মিতভাবে আপডেট করা হয় না। ফলে প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান করে সিস্টেমটিকে কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য করা প্রয়োজন, যেন ডিজিটাল ক্যাম্পাসের উদ্যোগ বাস্তবে শিক্ষার্থীদের উপকারে আসে।”

Link copied!