বৃহস্পতিবার ২৯, অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার ২৯, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --

ইসরায়েলে সরকার গঠনের সমীকরণে আরব দল, নেতানিয়াহুবিরোধীদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৫ পিএম

ইসরায়েলে সরকার গঠনের সমীকরণে আরব দল, নেতানিয়াহুবিরোধীদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত

ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সুযোগ তৈরি হলেও তা কাজে লাগাতে বিরোধীদের সামনে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য আরব দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। তবে বিরোধী শিবিরের একাংশ এই দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় আপত্তি জানাচ্ছে। ফলে আরব দলগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত এখন নেতানিয়াহুবিরোধীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গাজায় জাতি নিধন, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও লাখো ফিলিস্তিনির বাস্তুচ্যুতির প্রেক্ষাপটে গত মঙ্গলবার ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বুধবার সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখার সময়ও ভোট গণনা চলছিল। বুথফেরত জরিপ ও আংশিক ফলাফলে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কিংবা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোট—কোনোটিরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হওয়ার আভাস পাওয়া যায়নি।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত ৮৫ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট গণনা হয়েছে। এতে নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি, আইজেনকটের জোট ৪৮টি এবং আরব দলগুলো ১৯টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। আরব দলগুলোর সমর্থন পেলে বিরোধী জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা অতিক্রম করতে পারে। ফলে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনার পাশাপাশি ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আরব ভোটারদের অংশগ্রহণে বদলাচ্ছে সমীকরণ

ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশি ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিক। এবারের নির্বাচনে তাঁদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রাআম পার্টির অবস্থান শক্তিশালী করেছে। নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও বর্ণবাদের অভিযোগে ক্ষুব্ধ অনেক আরব নাগরিকও ভোট দিতে কেন্দ্রে গেছেন।

এবার ইসরায়েলে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। নেতানিয়াহুর অতি ডানপন্থী দলগুলোর সঙ্গে জোট এবং কট্টর ইহুদিদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়েও ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল।

সরকার পরিবর্তনের উদ্যোগে আরব নাগরিকদের অংশগ্রহণকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসুফ জাবারিন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, ‘নেতানিয়াহুর বিকল্প গড়তে চাইলে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’

তবে সমঝোতার ধরন কী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আরব দলগুলো সরাসরি সরকারে যোগ দিতে পারে, আবার সরকারে অংশ না নিয়েও বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে। যেকোনো সমঝোতার ক্ষেত্রে দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান ও শর্ত বিবেচনায় নিতে হবে।

আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় আপত্তি

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইজেনকটের শিবিরের অনেকেই আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের বিরোধিতা করছেন। ফলে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আগ্রহী বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

‘দ্য প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি’ বইয়ের লেখক অ্যান্টনি লোয়েনস্টাইন আল–জাজিরাকে বলেছেন, এই অনীহার পেছনে রয়েছে গভীর আরববিদ্বেষ। গণতন্ত্রের দাবি করা একটি দেশে সরকারে নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ মেনে নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে এমন বিতর্ক কেন হচ্ছে—সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আরব নাগরিকেরা দীর্ঘদিনের বর্জনের পরিবেশ পেরিয়ে ভোট দেওয়ার পর আবারও প্রত্যাখ্যাত হলে নিজেদের ‘গণতান্ত্রিক’ বলে দাবি করা রাজনৈতিক শিবিরের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আমরা ইহুদি-আরব প্রকৃত অংশীদারত্বে বিশ্বাস করি। নেতানিয়াহুর বিকল্প গড়তে চাইলে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

ইউসুফ জাবারিন, নেতা, জয়েন্ট লিস্ট

বিরোধীদের একাংশের সহযোগিতার আহ্বান

বিরোধী শিবিরের সবাই অবশ্য আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার বিরোধিতা করছেন না। ডেমোক্র্যাটস দলের আইনপ্রণেতা গিলাদ কারিভ আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর মতে, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে দেশের ‘ধ্বংসাত্মক’ গতিপথ ঠেকাতে এখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কারিভ বলেন, উদারপন্থী ইহুদি ও আরব জনগোষ্ঠী—উভয় ক্ষেত্রেই বিরোধীদের প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে। তাঁর দাবি, বিপুলসংখ্যক ভোটার নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা পূরণে বিরোধীদের একসঙ্গে কাজ করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

তবে সরকার পরিবর্তনের প্রশ্নের সঙ্গে ফিলিস্তিন বিষয়ে নীতিগত পরিবর্তনের বিষয়টি এক করে দেখার সুযোগ নেই। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রায় সব ইহুদি দলই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে। ফলে নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালেও ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ইসরায়েলের নীতিতে পরিবর্তন আসবে কি না, তা অনিশ্চিত।

সরকার গঠনে প্রেসিডেন্টের ভূমিকা

নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার পর দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ। সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের নেতাকেই যে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিতে হবে, এমন নয়। বরং কোন নেতা সংসদে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি রাখেন, সেটিই বিবেচনায় নেওয়া হবে।

নতুন নির্বাচন এড়াতে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি হারজোগ। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে আবারও নির্বাচনের প্রয়োজন হতে পারে।

নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নেতানিয়াহু। তাই এবারের নির্বাচনের পর ইসরায়েলে সরকার পরিবর্তন হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে আরব দলগুলোর সঙ্গে বিরোধীদের সমঝোতা এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার সক্ষমতার ওপর।


 

Link copied!