মৌলভীবাজার থেকে রাজন হোসেন তৌফিক
প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৯ পিএম
বুধবার ৩০, সেপ্টেম্বর ২০২৬ -- : -- --
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, মৌলভীবাজার
মৌলভীবাজারে মৃত্যুর ৩৫ বছর পর ৩ ভাই কবর থেকে উঠে জমি রেজিস্ট্রি করে দিলেন! এমনই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে সদর উপজেলায়। মৃত ব্যক্তির ছবির জায়গায় অন্য ব্যক্তির ছবি বসিয়ে জাল দলিল তৈরির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আদালতের নির্দেশে তদন্তে নেমেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
পিবিআই তদন্ত রিপোর্ট ও বাদীর অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার সদরের ঘাগটিয়া গ্রামের ফতেপুর মৌজার জে.এল নং-৮৪, এস.এ খতিয়ান নং-৫১৪, দাগ নং-১৬২১, ১৬২২ এবং আর.এস খতিয়ান নং-১৩৪, দাগ নং-১১৫০, ১১৫১ এর ০৯ শতক জমির মালিক ছিলেন মৃত মাছিম উল্লা, মৃত কাছিম উল্লা ও মৃত ওয়াছির উল্লা। এর মধ্যে ০৪ শতক কবরস্থান।
অভিযোগে জানা যায়, সদরের দুর্লভপুর এলাকার মৃত আইয়ুব আলীর পুত্র আমির উদ্দিন ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর ৫৯৫৮/২১ নং দলিলে ওই ৩ মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দাতা সাজিয়ে মৌলভীবাজার সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জমি রেজিস্ট্রি করে নেন। অথচ ৯ নং আমতৈল ইউনিয়ন পরিষদের মৃত্যু সনদ অনুযায়ী, মাছিম উল্লা ১৯৯০ সালে, ওয়াছির উল্লা ২০০৬ সালে এবং কাছিম উল্লা বহু বছর আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন।
শুধু তাই নয়, ওই জাল দলিল দিয়েই সদর সহকারী ভূমি অফিস থেকে ৮৯১০/২২-২৩ নং নামজারি মামলায় নিজ নামে নামজারি করেন আমির উদ্দিন। পরে ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর ৪৯০৫/২৪ নং হেবা দলিল মূলে স্ত্রী রসনা বেগমের নামে জমি হস্তান্তর করেন এবং ২৪২৯ নং মামলায় তার নামেও নামজারি করিয়ে নেন।
পরে ভুক্তভোগী রুবেল মিয়া আদালতে মামলা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর বিবিধ মোকদ্দমা নং-৩৯/২৫-২৬ দায়ের করলে শুনানি শেষে ৮৭৬ নং খতিয়ানের ১১৫১ দাগের জমি পূর্বের মালিক কাছিম উল্লা, মাছিম উল্লা ও ওয়াছির উল্লার নামে পুনর্বহাল করা হয়।
ভুক্তভোগী নাতি মো: রুবেল মিয়া বলেন, "আমার মৃত দাদাদের নাম ও ছবি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ ভুয়া ও জাল দলিল তৈরি করা হয়েছে। ভুয়া দলিলের ভিত্তিতে জালিয়াত চক্র গোপনে জমির নামজারি করিয়ে নিয়েছে। এই পুরো বিষয়টির সাথে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট সরাসরি জড়িত।"
এ বিষয়ে স্থানীয়রা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, একটি মৃত মানুষের জায়গায় কীভাবে রেজিস্ট্রি হয় এবং এর পেছনে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
রুবেলের মা বেদানা বেগম বলেন, "আমার শ্বশুররা মারা গেছেন অনেক আগে, এখন তাদের জীবিত দেখানো হয়েছে, আমি আল্লাহর কাছে আর আইনের কাছে বিচার চাই।"
অন্যদিকে অভিযুক্ত আমির উদ্দিন বলেন, "রুবেল মিয়া টাকা দাবি করে না পেয়ে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন।"
এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার সদর সাব-রেজিস্ট্রার ইয়াসমিন শিকদার বলেন, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দলিল লেখকসহ সংশ্লিষ্ট কারও জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে তাঁদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মৌলভীবাজার সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) লুৎফুন নাহার শারমীন বলেন, "দলিল সঠিকভাবে রেজিস্ট্রি হলে এবং রেকর্ডীয় মালিকের সাথে দাতার নামের মিল থাকলে সাধারণত নামজারি প্রদান করা হয়। দাতা জীবিত ছিলেন কি না, পরবর্তীতে কেউ আপত্তি করলে মিসকেস করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।"
মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে জমি জালিয়াতির এই ঘটনায় এখন পিবিআই তদন্তের দিকে তাকিয়ে আছে ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী।