প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৩ এএম
নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ প্রথম ওহির সূচনা হয়েছিল সুরা আলাকের পাঁচটি আয়াতের মাধ্যমে। এই পাঁচটি আয়াত ইসলামের জ্ঞানদর্শন, মানবমর্যাদা, স্রষ্টার পরিচয় এবং আত্মশুদ্ধির সংক্ষিপ্ত পরিচয় বহন করে।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘পড়ো, তোমার সেই প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ো, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না।’ (সুরা আলাক, আয়াত: ১-৫)
জ্ঞানের শুরু প্রতিপালকের নামে
ওহির প্রথম নির্দেশই হলো ‘পড়ো’। কিন্তু এই পড়া নিছক তথ্য আহরণ নয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘তোমার প্রতিপালকের নামে’ বাক্যটিও। অর্থাৎ ইসলামে জ্ঞানচর্চা স্রষ্টাবিচ্ছিন্ন কোনো কর্মকাণ্ড নয়। জ্ঞান মানুষের হাতে শক্তি তুলে দেয়, আর সেই শক্তি কোন পথে ব্যবহৃত হবে, তা নির্ধারণ করে আল্লাহর প্রতি জবাবদিহির অনুভূতি।
যে জাতি জ্ঞানকে এই দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে, তারাই একদিন জ্ঞানকে নিপীড়নের হাতিয়ার বানিয়েছে। তাই ওহির প্রথম বাক্যেই আল্লাহ জ্ঞানের সঙ্গে তাঁর নাম জুড়ে দিয়ে এই বিপদের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন।
মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য
ওহির পরবর্তী বাক্য মানুষকে তার আসল পরিচয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্তপিণ্ড থেকে।’ (সুরা আলাক, আয়াত: ২)
মানুষ যতই উন্নত হোক, তার সূচনা ছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র। সভ্যতার উন্নতি মানুষকে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখালেও এই আয়াত তার ও মাটির মধ্যকার সম্পর্কের কথা বর্ণনা করেছে সুনিপুণভাবে।
সৃষ্টির এই ক্ষুদ্র সূচনার কথা মনে রাখলে মানুষের চিন্তাজগতে একটি স্থায়ী ভারসাম্য তৈরি হয়, যার ফলে সে জীবনের প্রতিটি অর্জনে আল্লাহর অনুগ্রহের অনুভূতি হৃদয়ে জাগ্রত রাখে, নিজের কৃতিত্বের অহংকারে ডুবে যায় না।
শিক্ষার প্রকৃত উৎস
তৃতীয় ও চতুর্থ আয়াতে জ্ঞানকে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘পড়ো, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন।’ (সুরা আলাক, আয়াত: ৩-৪)
কলম এখানে শুধু একটি লেখনী নয়, এটি জ্ঞান অর্জন, সংরক্ষণ, প্রজন্মান্তরে তা পৌঁছে দেওয়া এবং মানবসভ্যতার স্মৃতি ধরে রাখার প্রতীক। লিখে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাক্য শত বছর পরও কাউকে জাগিয়ে তুলতে পারে, লিখিত একটি মূল্যবান বই বহু প্রজন্মের জীবনকে আলোকিত করতে পারে।
ইসলামে কলমের মর্যাদা নিছক লেখার উপকরণ হিসেবে নয়, সত্য ও কল্যাণের বাহন হিসেবে। এই কারণেই ইসলামি সভ্যতার সোনালি যুগে গ্রন্থাগার, পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ ও জ্ঞানচর্চাকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
মানুষের জ্ঞানের প্রকৃতি
পঞ্চম আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।’ (সুরা আলাক, আয়াত: ৫)
মানুষ জন্মগতভাবে সবকিছু জানে না। তার জ্ঞান অর্জিত, সীমিত এবং ক্রমবর্ধমান। আজ যে বিষয়টি অজানা, আগামীকাল তা আবিষ্কৃত হতে পারে, কিন্তু জ্ঞানের পরিধি যতই বাড়ে, অজানার বিস্তৃতিও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সত্যিকারের জ্ঞান মানুষকে ‘আমি সব জানি’ বলার সাহস দেয় না, বরং নিজের অজ্ঞতার পরিধি বুঝতে শেখায়।
প্রথম ওহির সৌন্দর্য
প্রথম ওহির অসাধারণ সৌন্দর্য হলো, এখানে জ্ঞান এসেছে ইমানের ছায়ায়। পড়া, সৃষ্টি, কলম ও শিক্ষা—প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গেই স্রষ্টার পরিচয় ও অনুগ্রহের কথা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, ইসলামের শিক্ষাপ্রকল্প কেবল মেধাবী মানুষ তৈরি করতে চায় না, বরং বিবেকবান মানুষ গড়তে চায়।
আজকের পৃথিবীতে তথ্যের অভাব নেই। মুহূর্তেই অসংখ্য তথ্য মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে যায়। প্রযুক্তির এই বিস্ফোরণ মানুষকে দ্রুতগামী করেছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে তাকে অস্থির, অসহিষ্ণু ও নৈতিকভাবে দিশাহীনও করে তুলছে।
‘পড়ো’ আহ্বান দিয়ে যে দ্বীন তার যাত্রা শুরু করেছে, সে দ্বীন মানুষকে কেবল পাঠক হতে বলেনি, তাকে সত্যান্বেষী, জ্ঞানের বাহক এবং স্রষ্টার অনুগত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
-
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা
