শনিবার ২৫, জুলাই ২০২৬

শনিবার ২৫, জুলাই ২০২৬ -- : -- --

চল, নদীতে নৌকা ভ্রমণ দিয়ে আসি!

বাকৃবি থেকে মো.আবু হানিফ

প্রকাশিত: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৯ এএম

ছবি।ক্যাম্পাস রিপোর্ট

সেমিস্টার ফাইনাল মানেই ক্যাম্পাসে এক অদ্ভুত নীরবতা। ক্লাস নেই, করিডোর ফাঁকা, সবাই ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে। তবুও সেদিন বিকেলে আমাদের সাতজনের গন্তব্য ছিল অনিবার্য। ফুয়াদ স্যারের স্বাক্ষর করা অ্যাসাইনমেন্ট সংগ্রহ করতে হবে, কারণ ভাইভা পরীক্ষায় সেটিই হবে প্রবেশপত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ।

বেলা সাড়ে তিনটা থেকে আমরা ফ্যাকাল্টির সামনে অপেক্ষা করছি। মিনিট গড়িয়ে ঘণ্টা পার হয়ে গেল, কিন্তু স্যারের দেখা নেই। চারটা, তারপর সাড়ে চারটা। অপেক্ষা যখন বিরক্তিতে রূপ নিচ্ছে, তখনই রাফাতের ঘোষণা, “চল, নদীতে নৌকা ভ্রমণ দিয়ে আসি!”

আর দেরি নয়। সবাই হেঁটে চলে গেলাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদের ঘাটে। সারি সারি নৌকা, লাল-নীল-সবুজ পালে সাজানো। যেন আমাদের অপেক্ষাতেই ছিল তারা।

ঘাটে পৌঁছাতেই মাঝি মামা বুঝে গেলেন, আমরা কিছুক্ষণ নদীর বুকে সময় কাটাতে চাই। শুরু হলো দরকষাকষি। জনপ্রতি ৬০ টাকা শুনে সবাই একসঙ্গে আপত্তি জানালাম। সোয়াইব হেসে বলল, “আমরা কিন্তু শিক্ষার্থী, আবার সঙ্গে সাংবাদিকও আছে। বেশি নিলে পরে নিউজ হয়ে যাবে!” কথাটা শুনে মাঝি মামাও হেসে ফেললেন। শেষে দর ঠিক হলো ২০০ টাকায়। সাতজনের জন্য এর চেয়ে ভালো চুক্তি আর কী হতে পারে!

তবে নৌকায় ওঠার আগেই দেখা গেল সাঈদ উধাও। একটু খোঁজ করতেই রহস্যের সমাধান। তিনি ফোনে ব্যস্ত, ওপাশে তার প্রিয়তমা স্ত্রী। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো বন্ধুমহলের হাসাহাসি। কারও মন্তব্য, “অনুমতি না নিয়ে নৌকায় ওঠা যাবে না!” শেষ পর্যন্ত অবশ্য অন্য পাশ দিয়ে এসে সে নৌকার স্থায়ী যাত্রী হয়েছে তা সোয়াইবের নজরে ছিল না। তাই সে তাঁর খোঁজে নৌকা থেকে নেমেছে।

সাঈদের খোঁজ না পাওয়ায় সোয়াইবকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হলো। যেহেতু সে নেমেছেই, তাই সবার জন্য ভাজা বাদাম নিয়ে আসতে হবে। বন্ধুত্বের আবদার বলে কথা, আপত্তির সুযোগ কোথায়!

নৌকা ছাড়তেই প্রথম প্রশ্ন, “কে কে সাঁতার জানিস না?” কারণ,  হঠাৎ যদি নৌকা ডুবে যায়! সাইদুল আর মানিক হাত তুলতেই শুরু হলো উপদেশের বন্যা। সাইদুলের হাতে ছিল একটি ছাতা। তাকে বলা হলো, “নৌকা ডুবলে ছাতাটা খুলে উল্টো করে ধরে ভেসে থাকিস!” আর মানিককে পরামর্শ দেওয়া হলো, “ফিজিক্সের ভেক্টরের লব্ধির দিকে ১২০ ডিগ্রি কোণে হাত-পা নাড়াতে থাকবি, দেখবি কোনো না কোনো তীরে ঠিকই পৌঁছে যাবি!” যুক্তির চেয়ে হাসিই তখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আকাশে মেঘ ছিল, কিন্তু রোদের উজ্জ্বলতায় মনে হচ্ছিল দুপুর গড়ায়নি। নদীর স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলছিল নৌকা। মাঝি মামারও ছিল নিজস্ব দর্শন,যেন যেমন গুড় তেমন মিষ্টি, মানে “যেমন টাকা, তেমন সময়।”  অল্পক্ষণ স্রোতের অনুকূলে চলার পর তিনি নৌকা ঘুরিয়ে নিলেন প্রতিকূলে। তবে স্রোতের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, নদীর পাড় ঘেঁষে চতুরতার সঙ্গে এগিয়ে চললেন।

পথে দেখা মিলল কয়েকজন কিশোরের, যারা নিশ্চিন্তে নদীতে সাঁতার কাটছে। একজন ছোট্ট ছেলে কোমরসমান পানিতে মাছ ধরছিল। আমাদের প্রশ্নে সে লাজুক হাসি দিয়ে উত্তর দিল, আর নৌকা দূরে সরে যেতেই তার মুখে ফিরে এল আত্মবিশ্বাস।

ফেরার পথে সবার জোড়াজুরিতে সাইদুল গেয়ে উঠল তার বিখ্যাত গান “একাত্তরের সেই মুক্তিযুদ্ধতে,,, সুফি সম্রাট দেওয়ান বাগী....”.... । কিন্তু দুই লাইন শেষ হওয়ার আগেই নৌকা ঘাটে ভিড়ে গেল। গান অসমাপ্ত রয়ে গেল, কিন্তু বিকেলের গল্প সম্পূর্ণ হয়ে গেল।

এই পুরো সময়টা ক্যামেরা আর মোবাইল হাতে মুহূর্তগুলো বন্দি করতে ব্যস্ত ছিল মেহেদী। নৌকা ভ্রমণের মোট টাকার অর্ধেক সে একাই দেয় বাকিটা সবাই ভাগাভাগি করে কেউ দশ কেউ বিশ কেউ আবার চল্লিশ, তবে আমার কাছে খুচরা টাকা না থাকায় আমি সেই ভাগে অংশ নিতে ব্যর্থ হই। ব্যর্থ হলেও সে ব্যর্থতা মেনে নিতে পারেননি সাঈদ বিন ইমরান। তাই ব্যার্থতা উত্তরণের পথ দেখিয়ে দেয় সাইদুর বলে তুই আমাদের নিয়ে লেখালেখি করবি শিরোনাম দিবি স্যারের সাক্ষর করা অ্যাসাইনমেন্ট দিতে দেরি, তাই তাঁর ছাত্রদের নৌকায় ঘোরাঘুরি।

 ছবি, ভিডিও, হাসি, ঠাট্টা, নদীর ঢেউ, বাদামের খোসা আর বন্ধুদের অফুরন্ত আড্ডা মিলে তৈরি হলো এমন এক বিকেল, যা কোনো পরিকল্পনার অংশ ছিল না।

অবশেষে মনে পড়ল, আমরা তো এসেছিলাম অ্যাসাইনমেন্ট নিতে! সেই অপেক্ষাই আমাদের উপহার দিল ব্রহ্মপুত্রের বুকে ঘণ্টাব্যাপী অবিস্মরণীয় স্মৃতি।

আর ঘাট ছাড়ার পূর্বে সাইদুলের শেষ মন্তব্যটিই যেন পুরো গল্পের সবচেয়ে উপযুক্ত শিরোনাম হয়ে রইল, “স্যারের স্বাক্ষর করা অ্যাসাইনমেন্ট দিতে দেরি, তাই তার ছাত্রদের নৌকায় ঘোরাঘুরি!”

Link copied!