প্রকাশিত: ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৩ এএম
ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কয়েকটি ১০ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মিত হচ্ছে, যেখানে কোনো রকম নিরাপত্তা ছাড়াই কাজ করে যাচ্ছেন শ্রমিকেরা। বিভিন্ন সময়ে আহত এবং নিহত হয়েছেন একাধিক নির্মাণ শ্রমিক। অথচ প্রকল্পের সাইটে দেখা যায়- প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কোনো রকম নিরাপত্তা ছাড়াই কয়েকশ ফুট উঁচুতে ঝুলে ঝুলে কাজ করছেন শ্রমিকরা।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ১০ তলা ইউটিলিটি ভবন-৪ এ স্যানিটারি কাজ করার সময় পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন নির্মাণশ্রমিক রাসেল। সহকর্মীরা তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। নিহত রাসেল চাঁদপুর থেকে কাজে এসেছিলেন এই প্রকল্পের শ্রমিক হিসেবে।
এর আগে, গত বছরের ২২ মার্চ নির্মাণাধীন একটি ১০ তলা ভবন থেকে পড়ে মারা যান রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাসিন্দা নির্মাণশ্রমিক মো. ইব্রাহিম। সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোজা অবস্থায় কাজ শেষে নিচে নামার সময় ভবনের ফাঁকা অংশের পাশে দাঁড়ালে মাথা ঘুরে নিচে পড়ে যান তিনি। পরে ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই সময় শ্রমিকরা অভিযোগ করেছিলেন, বারবার দাবি জানানো সত্ত্বেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহ করেনি।
এরও আগে, ২০১৯ সালের ১৫ মে নির্মাণাধীন তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (বর্তমান বিদ্রোহী হল) ছাত্র হলের ১০ তলা ভবনের অষ্টম তলায় কাজ করার সময় নিচে পড়ে মারা যান ২০ বছর বয়সি নির্মাণশ্রমিক হাসান। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ওই ঘটনাতেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। তবে সেই রিপোর্ট আর কোনোদিন প্রকাশ্যে আসেনি।
শুধু মৃত্যুই নয়, ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন একটি ছাত্র হলের বারান্দার ছাদ ধসে অন্তত ১০ নির্মাণশ্রমিক আহত হন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, ঢালাইয়ের সময় দুর্বল সাপোর্ট ব্যবহার করায় ছাদটি ধসে পড়তে পারে। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করলেও সেই তদন্তের প্রতিবেদন আর সামনে আসেনি। সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে কিনা, তাও স্পষ্ট নয়। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আবারও প্রাণহানির ঘটনা ঘটায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া এসব দুর্ঘটনার পর প্রতিবারই তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হলেও নির্মাণশ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, নিরাপত্তা সরঞ্জামের বাধ্যতামূলক ব্যবহার এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে প্রতিটি নির্মাণস্থলে শ্রমিকদের জন্য হেলমেট, সেফটি বুট, গ্লাভস, গগলস এবং মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক এবং উচ্চতায় (২ মিটারের বেশি) কাজ করার সময় শ্রমিকদের সুরক্ষা বেল্ট পরা নিশ্চিত করতেও বলা হয়েছে। এছাড়া কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও ভারসাম্য রক্ষায় মাচা নির্মাণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ও মজবুত উপকরণ ব্যবহার করা ও তা নিয়মিত পরিদর্শন করতে বলা হয়েছে এবং উন্মুক্ত ছাদ, লিফ্ট ও সিঁড়ির আশেপাশে নিরাপত্তা রেলিং ও সতর্কতামূলক জাল রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আইনে আরও বলা হয়েছে, কর্মস্থলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মালিকপক্ষ শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসার খরচ বহন করতে আইনত বাধ্য।
এ বিষয়ে এনএস এন্টারপ্রাইজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার ওয়াশিম বলেন, আমরা শ্রমিকদের সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করেছি। ভবনের কাজ প্রায় শেষ হওয়ায় যারা ভবনের ভেতরে কাজ করছেন, তারা সেফটি বেল্ট ব্যবহার করছেন না। তবে যারা উঁচু স্থানে কাজ করছেন, তারা সেফটি বেল্ট পরেই কাজ করছেন।
সম্প্রতি শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনার পর নির্মাণাধীন ১০ তলা ইউটিলিটি ভবন-৪ এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান খান অ্যান্ড সন্স বিডি লিমিটেডের ইঞ্জিনিয়ার জসিম বলেন, যে ছেলেটি মারা গেছেন,তিনি কাজে যাওয়ার আগে তাকে সেফটি বেল্ড দেওয়া হয়েছে এবং তার সাথে যে হেলপার আছে তাকেও সেফটি বেল্ড দেওয়া হয়েছে। যিনি মারা গেছেন তিনি সেই বেল্ড পরেনি, তার হেলপারকে বলেছে বেল্ড পরা লাগবে না, কোনো সমস্যা নাই। এসব বিষয়ে জানা গেছে হেলপারের মুখ থেকে।
বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের স্বার্থে সেই হেলপারের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে তারা কোনো সহায়তা করেনি।
প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সৈয়দ মোফাছিরুল ইসলাম বলেন, আমাদের ইঞ্জিনিয়ার অফিস আছে, ওরা নিয়মিত এসব দেখভাল করে, আমরা প্রকল্প পরিচালক অফিস সবসময় যেতে পারি না। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তা মানতে নির্দেশনা দেওয়া আছে। এখানে আরেকটা বিষয়, শ্রমিকরা নিজেরাও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কাজে যেতে চান না।
এ নিয়ে প্রকৌশল দপ্তরে যোগাযোগ করলে কোনো উপ-পরিচালকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ নিয়ে পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের পরিচালক প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান বলেন, তারা প্রতিবেদন দিলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো। আমাদের বাংলাদেশে যে ইন্সুরেন্স পলিসি আছে, সেখানে মারা গেলে নির্ধারিত এক লাখ টাকা দেওয়া হয়। এক লাখ টাকায় কি কোনো জায়গায় সমাধান হয়? সেখানে তাদের ফ্যামিলির দায়িত্বটা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেই নিতে হয়, যে কোন কনডাক্টরের কাজ করেছে তাকেই নিতে হবে দায়িত্ব। তাকে চাপ দেওয়া হয়েছে, কত টাকা কিংবা কি করে সমাধান করবে সেটা তাকেই বলা হয়েছে।
