মঙ্গলবার ২১, জুলাই ২০২৬

মঙ্গলবার ২১, জুলাই ২০২৬ -- : -- --

‎গাছ কাটা নিয়ে অসন্তোষের মাঝেই নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণে নিষেধাজ্ঞা

জাককানইবি থেকে রবিউল ইসলাম শাকিল

প্রকাশিত: ০৮ জুলাই ২০২৬, ১১:০৯ এএম

ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় (জাককানইবি) ক্যাম্পাসে গাছ কাটা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তীব্র অসন্তোষের মাঝেই এবার কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া যেকোনো ধরনের বৃক্ষরোপণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার খন্দকার নাজমুল হাসান স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে ‘আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা’ ও ‘দ্বিমুখী অবস্থান’ হিসেবে দেখছেন শিক্ষার্থী ও পরিবেশবাদীরা। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যানের কার্যকারিতা ও উদ্দেশ্য নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

‎প্রশাসনের পক্ষ থেকে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বৃক্ষরোপণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিত ও নিয়মবহির্ভূতভাবে গাছ লাগানো হচ্ছে। যত্রতত্র এভাবে গাছ রোপণের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যান এবং ভূগর্ভস্থ ইউটিলিটি লাইন (বিদ্যুৎ, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা ক্যাম্পাসের নান্দনিক পরিবেশকে ব্যাহত করছে। এই পরিস্থিতিতে উপাচার্য মহোদয়ের অনুমোদনক্রমে এখন থেকে ক্যাম্পাসের যেকোনো স্থানে গাছ রোপণের পূর্বে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করা হয়।

‎তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই নতুন নির্দেশনা এমন এক সময়ে এলো যখন ক্যাম্পাসজুড়ে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে ‘চির উন্নত মম শির’ স্মৃতিস্তম্ভ পর্যন্ত সড়কের একপাশের জারুল, সোনালু ও কৃষ্ণচূড়াসহ প্রায় ৯৮টি গাছ কেটে ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সবুজ ক্যাম্পাস উজাড় করার এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছিলেন।
‎প্রশাসনের এই দ্বিমুখী অবস্থানের সমালোচনা করে শিক্ষার্থী রাইয়ানুল করিম জানান, একদিকে প্রশাসন যেমন গাছ কাটছে, তেমনি শিক্ষার্থীরা কেউ যদি বৃক্ষরোপণ করে সে স্থানেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়াটা চরম বেমানান। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ—একদিকে প্রশাসন উন্নয়নের দোহাই দিয়ে ক্যাম্পাসের ছায়ানিবিড় পরিবেশ নষ্ট করে গাছ কাটার পরিকল্পনা করছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা যখন নিজ উদ্যোগে ক্যাম্পাস সবুজায়নের চেষ্টা করছে, তখন অনুমতি নেওয়ার নামে এক ধরনের আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে।
‎এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্তের পর প্রশাসনের উন্নয়ন পরিকল্পনা বা ‘মাস্টারপ্ল্যান’ এর বাস্তব ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক শিক্ষার্থী ও পরিবেশ কর্মী রাতুল মুন্সী। তিনি বলেন, "আসলে প্রথমে আমার যেটা মনে হয় সেটা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যানটা কী? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কি ভবন থেকে শুরু করে সকল কাজকর্ম হচ্ছে? নাকি যখন যে প্রশাসন আসছে, তারা এসে নিজেদের মতো করে কিছু মাস্টারপ্ল্যান করছে? এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মারাত্মক ক্ষতি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, আমাদের শক্তিশালী কোনো প্ল্যান নাই যে পাঁচ বছর পর ক্যাম্পাস কেমন হবে। যেখানেই ফাঁকা জায়গা, সেখানেই ভবন তৈরি হচ্ছে; আসলে এটা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যান?"
‎বৃক্ষরোপণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও যোগ করেন, "বৃক্ষরোপণ নিয়ে মাস্টারপ্ল্যানে দূরদর্শী তেমন কিছু নেই। আমি ডিপিডি হাফিজের কাছ থেকে যতদূর জেনেছি, তারা ক্যাম্পাসে ছয় ফিটের উপরে কোনো গাছ রাখবে না। তাহলে এই ক্যাম্পাস কি শেষ পর্যন্ত রোদ আর তাপের নগরী হবে?"

‎পরিবেশবিদ ও শিক্ষার্থীদের মতে, প্রশাসনের এই পদক্ষেপটি যদি সত্যিই একটি সঠিক ও সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে বৃক্ষরোপণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত হয়, তবেই তা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মঙ্গলকর হবে। কিন্তু যদি শুধু নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত সীমাবদ্ধ থাকে এবং বাস্তবে এর কোনো সঠিক প্রয়োগ না হয়, তবে পুরো বিষয়টি "যেই লাউ সেই কদু"র মতোই অর্থহীন হয়ে থাকবে।

Link copied!