প্রকাশিত: ৩১ মে ২০২৬, ০৯:২২ পিএম
মাদকাসক্তির ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে তরুণ সমাজে। কিশোর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী, বিভিন্ন স্তরেই দেখা যাচ্ছে এর প্রভাব। হতাশা, বেকারত্ব, পারিবারিক সংকট, খারাপ সঙ্গ ও মাদকের সহজলভ্যতা এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আজ ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে মাদকমুক্ত ভবিষ্যৎ গঠনের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে কথা বলেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তুলে ধরেছেন ক্যাম্পাস রিপোর্ট ২৪-এর কুবি প্রতিনিধি মংক্যএ মার্মা।
“মাদক প্রতিরোধে প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা ও সচেতনতার সমন্বয়”
সামিয়া নাজ স্বীকৃতি, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
বর্তমান সময়ে মাদকাসক্তি তরুণ সমাজের জন্য একটি গুরুতর সামাজিক ও মানসিক সংকট। এটি শুধু একজন ব্যক্তির ভবিষ্যৎ নষ্ট করে না, বরং পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক তরুণ হতাশা, কৌতূহল, বন্ধুদের প্রভাব বা পারিবারিক সমস্যার কারণে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কুবি শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা মনে করি, এই সংকট মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে নিয়মিত প্রচার, কাউন্সেলিং সেবা এবং আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মাদক সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তরুণদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে একটি মাদকমুক্ত, সুস্থ ও সম্ভাবনাময় সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
"মাদকমুক্ত প্রজন্ম গড়তে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে"
তাসনিমুর রহমান তানিম, লোক প্রশাসন বিভাগ
মাদকাসক্তি বর্তমানে তরুণ সমাজের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক শিক্ষার্থী মানসিক চাপ, হতাশা, পারিবারিক সমস্যা কিংবা ভুল সঙ্গের কারণে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু সাময়িক স্বস্তি দিতে পারলেও মাদক শেষ পর্যন্ত একজন মানুষের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দেয়। আমার মতে, এ সমস্যা সমাধানে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে নিয়মিত সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ। তাই একটি সুস্থ, সচেতন ও মাদকমুক্ত প্রজন্ম গড়ে তুলতে আমাদের সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
“প্রতিটি অপরাধের পেছনেই থাকে একটি গল্প”
সুপ্ত ভৌমিক, আইন বিভাগ
আজ যদি একটি আদালত বসে, আর সেখানে “মাদক” একটি মামলার আসামি হয়ে দাঁড়ায় তবে প্রশ্ন উঠবে, আসল অপরাধী কে? মাদক, নাকি সেই সমাজ, যে নিঃশব্দে একজন তরুণকে তার দিকে ঠেলে দেয়? কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপটে আমরা দেখি- অপূর্ণ স্বপ্ন, অব্যক্ত চাপ, আর অদৃশ্য একাকীত্ব অনেককে এমন এক পথে নিয়ে যায়, যেখানে মাদক তার পালানোর দরজা হয়ে ওঠে। আইনের চোখে এটি অপরাধ কিন্তু প্রতিটি অপরাধের পেছনে থাকে একটি গল্প, একটি ভাঙা মানসিকতা, একটি অবহেলিত আর্তনাদ। আমরা কি শুধু শাস্তি দিয়েই এই সমস্যার সমাধান চাই? নাকি আমরা সাহস করে স্বীকার করব আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, আমাদের সামাজিক কাঠামোও এই অপরাধে নীরব অংশীদার? উত্তরণ তাই কেবল আইনের কঠোরতায় নয়; বরং মানবিকতা, সচেতনতা এবং পারস্পরিক দায়বদ্ধতায়। বিশ্ববিদ্যালয়কে হতে হবে এমন এক জায়গা, যেখানে একজন তরুণ বিচার নয়, বোঝাপড়া পায়; যেখানে পতনের আগে কেউ তার হাতটা ধরে। কারণ, প্রতিটি আসামির ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটি সম্ভাবনা যাকে আমরা যদি সুযোগ দিই, তবে সে অপরাধী নয়, পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
“অন্ধকারের পথে নয়, প্রয়োজন একটি হাত”
নুসরাত জাহান রিফাহ, লোক প্রশাসন বিভাগ
স্বপ্ন দেখা মানুষগুলো হঠাৎ হারিয়ে যায়- রাস্তায় নয়, নিজের ভেতরে। আজকের তরুণ প্রজন্ম যখন বাস্তবের কঠিন দেয়ালে বারবার ধাক্কা খায়, তখন সে খোঁজে একটুখানি স্বস্তি। আর সেই দুর্বল মুহূর্তেই মাদক এসে পাশে দড়ায়, "আমি আছি।" সংকটটা আসলে মাদকের নয়, সংকট সেই গভীর একাকীত্বের। যে একাকীত্ব পরিবারের ভিড়েও জন্ম নেয়, সাফল্যের চাপে বেড়ে ওঠে, আর নীরবতায় পরিপক্ব হয়। উত্তরণ আসবে না কেবল আইনের কঠোরতায়। আসবে যেদিন একজন বাবা ফলাফলের আগে জিজ্ঞেস করবেন "তুমি কেমন আছ?" যেদিন একজন বন্ধু বিচার না করে পাশে বসবে। মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার আগে গড়তে হবে অনুভূতি ধারণ করার মতো একটি মানবিক পরিবেশ। কারণ যে তরুণের হাত ধরার মানুষ আছে, সে কখনো অন্ধকারের দিকে হাঁটে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তি শুধু একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর নয়, এটি পরিবার, সমাজ ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্যও বড় হুমকি। মাদকের কারণে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি বাড়ছে অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতা। এ সংকট মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তরুণদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হতে পারে উত্তরণের পথ। মাদককে না বলে জীবন, স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে বেছে নিলেই গড়ে উঠবে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত সমাজ।
