রাশেদুজ্জামান রাশেদ,জবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫ মে ২০২৬, ১০:০৭ পিএম
শনিবার ১৬, মে ২০২৬ -- : -- --
ছবি।ক্যাম্পাস রিপোর্ট
দীর্ঘ আন্দোলন ও শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক দাবির প্রেক্ষিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিরসনে শুরু হওয়া ‘বাণী ভবন’ ও ‘হাবিবুর রহমান হল’এর নির্মাণকাজ এখন ধীরগতির কারণে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কাজের গতি অত্যন্ত ধীর হওয়ায় তাদের বহু প্রতীক্ষিত আবাসন সুবিধা আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনের জন্য শিক্ষার্থীদের দাবীর মুখে ৬ তলা বিশিষ্ট আবাসিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস স্থাপন: ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণ সাইটের দায়িত্ব সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরের ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের অধীন ২৫ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নের প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইফতেখার আলমের কাছে হস্তান্তর করেন।
হস্তান্তরের সময় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে নির্মাণকাজে দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই সীমিত বলে অভিযোগ উঠেছে।
অল্প সংখ্যক শ্রমিক দিয়ে চলছে কাজ
সরেজমিনে দেখা যায়, বাণী ভবনের নির্মাণকাজ এখনো বেজমেন্ট পর্যায়েই আটকে রয়েছে। উপরের কাঠামোগত কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি চোখে পড়েনি। কোনোদিন মাত্র ৫ জন, আবার কোনোদিন ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, “কাজের ধরন অনুযায়ী শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।” তবে শিক্ষার্থীদের মতে, এত অল্প সংখ্যক শ্রমিক দিয়ে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা বাস্তবসম্মত নয়।
অপরদিকে হাবিবুর রহমান হলের সামান্য কিছু অংশে বেজমেন্টের কাজ সম্পন্ন হলেও অধিকাংশ জায়গায় এখনো নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি। প্রকল্প এলাকায় শ্রমিক উপস্থিতিও খুব কম দেখা যায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকায় কাজের অগ্রগতি আরও ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে বন্ধ কাজ
বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) আমিনুল ইসলাম জানান, হাবিবুর রহমান হলের কাজ বন্ধ থাকার বিষয়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত দেখানো হয়েছে।
তিনি বলেন,“হাবিবুর রহমান হল ও বাণী ভবনের নির্মাণাধীন কার্যক্রম নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। হাবিবুর রহমান হলের কাজ বন্ধের বিষয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অভিযোগ দেখান সেনাবাহিনী। তবে আমরা তাদের বলেছি এখন আর জ্বালানি সংকট নেই, তাহলে কেন কাজ বন্ধ থাকবে? তখন তারা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে।”
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ বন্ধ থাকা প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।প্রশাসনের তদারকির অভাবের অভিযোগ:শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে প্রশাসনের কার্যকর তদারকির অভাব রয়েছে। মাঝে মধ্যে সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্য এলেও কাজের বাস্তব অগ্রগতি খুব একটা দেখা যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন,“হাবিবুর রহমান হল এবং বাণী ভবনের কার্যক্রম সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।”
এদিকে নির্মাণকাজে নিয়োজিত এক নিরাপত্তাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত দুই মাস ধরে তিনি বেতন পাননি। ফলে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পিডি আমিনুল ইসলাম বলেন,“বাণী ভবনে সামান্য কিছু শ্রমিক কাজ করছে, এটা নিয়ে আমরা আরও বেশি উদ্বিগ্ন। এখন বর্ষা মৌসুম চলে আসছে। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ হওয়া কঠিন হতে পারে।”
তিনি আরও জানান, সেনাবাহিনীকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বসে দ্রুত সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে।শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন,“দীর্ঘদিন ধরে আবাসন সংকটে ভুগছি। নতুন হল নির্মাণের ঘোষণা শুনে আশা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু কাজের বর্তমান গতি দেখে মনে হচ্ছে নির্ধারিত সময়েও শেষ হবে না।”
একই ব্যাচের শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলেন,“বাণী ভবনের কাজ এখনো বেজমেন্টেই আটকে আছে। এত ধীরগতিতে কাজ চললে শিক্ষার্থীরা কবে হলে উঠতে পারবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।”
১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন,“হাবিবুর রহমান হলের কাজ প্রায় বন্ধ। প্রশাসনের আরও কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।”
দ্রুত কাজ শেষের আশ্বাস প্রশাসনের
জকসুর ভিপি মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন,“আমরা বাণী ভবনের কাজের ধীরগতি দেখেছি এবং হাবিবুর রহমান হলে ঈদুল ফিতরের পরবর্তী সময় থেকে কাজ বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে পিডি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করেছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইস উদ্দীন বলেন,“হাবিবুর রহমান হলের কাজ করছে সেনাবাহিনী। তারা আমাদের জানিয়েছে কাজ চলছে। এরপরও গত ১০ তারিখে আমি সেনাবাহিনীর পিডিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে কাজের গতি বাড়ানোর অনুরোধ করেছি।”
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল হিসেবে শুরু হওয়া এই দুই আবাসিক ভবনের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের তীব্র আবাসন সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।