রবিবার ১৩, সেপ্টেম্বর ২০২৬

রবিবার ১৩, সেপ্টেম্বর ২০২৬ -- : -- --

ব্রেন স্টিমুলেশন গবেষণায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, IEEE Best Paper Award পেলেন জাবিপ্রবির তানভীর

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫০ পিএম

IEEE Best Paper Award অর্জন করেছেন জাবিপ্রবির EEE বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তানভীর।

ওষুধ কিংবা এর সঙ্গে সম্পর্কিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই চৌম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশকে উদ্দীপিত করে বিষণ্নতার মতো মানসিক সমস্যার চিকিৎসার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করে IEEE Best Paper Award অর্জন করেছেন জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবিপ্রবি) শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তানভীর।

সম্প্রতি ঢাকার IUBAT বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত 5th IEEE BECITHCON 2026 সম্মেলনে তিনি এ সম্মাননা অর্জন করেন। কনফারেন্সটির পূর্ণ নাম IEEE International Conference on Biomedical Engineering, Computer and Information Technology for Health।

স্নাতক সম্পন্ন করার আগেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন স্বীকৃতি অর্জন করেছেন জাবিপ্রবির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (EEE) বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তানভীর।

তানভীরের গবেষণার প্রধান বিষয় ছিল Transcranial Magnetic Stimulation বা TMS-এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটারকে সর্বোত্তম পর্যায়ে নিয়ে আসা। গবেষণায় বিশেষভাবে মস্তিষ্কের Left Dorsolateral Prefrontal Cortex বা F3 অঞ্চলকে লক্ষ্য করে চৌম্বকীয় ক্ষেত্র প্রয়োগের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় নিউরনকে কীভাবে পুনরায় সক্রিয় করা যায়, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণাটি মোট তিনটি ধাপে পরিচালিত হয়। প্রথম ধাপে TMS প্রয়োগের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত কয়েল নির্বাচন করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে নির্দিষ্ট স্থানে কয়েল স্থাপন করে এর সর্বোত্তম কোণ নির্ধারণ করা হয়। তৃতীয় ধাপে কয়েল ও মস্তিষ্কের মধ্যকার দূরত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে ইলেকট্রিক ফিল্ডের শক্তির ভারসাম্য বিশ্লেষণ করা হয়।

ওপেন-সোর্স সিমুলেশন সফটওয়্যার SimNIBS ব্যবহার করে পরিচালিত এ গবেষণাটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি নতুন ধরনের কাজ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে গবেষণার এ পর্যায়ে পৌঁছানোর পথ তানভীরের জন্য সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতি আগ্রহ থাকলেও গণিতে নিজেকে কিছুটা দুর্বল মনে করতেন তিনি। নিজের পরিচয়ও তিনি বিভাগের একজন গড়পড়তা শিক্ষার্থী হিসেবে দেন।

তাঁর এ সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তাঁর একাডেমিক সুপারভাইজার ও EEE বিভাগের প্রভাষক মো. আমিমুল ইহসান।

গবেষণার সময় প্রয়োজনীয় রিসোর্সের সীমাবদ্ধতা এবং ইন্টারনেট ও ইউটিউবে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ায় বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে তানভীরকে। তবে নিয়মিত লিটারেচার স্টাডি এবং সুপারভাইজার আমিমুল ইহসানের ধারাবাহিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে এসব বাধা অতিক্রম করেন।

গত ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক এ কনফারেন্সে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৭০০টিরও বেশি গবেষণাপত্র জমা পড়ে। সেগুলোর মধ্য থেকে প্রায় ১৭০টি গবেষণাপত্র উপস্থাপনের জন্য নির্বাচিত হয়।

৪ সেপ্টেম্বর সকালে তানভীর তাঁর গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। পরবর্তী প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকদের করা টেকনিক্যাল প্রশ্নেরও তিনি সফলভাবে উত্তর দেন।

৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। সেখানে দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের উপস্থিতিতে তানভীর নিজের পেপার পুরস্কার পাবে—এমন কোনো প্রত্যাশা তাঁর ছিল না। তাই তিনি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেও উপস্থিত হননি এবং বাসায় অবস্থান করছিলেন।

পরে সন্ধ্যায় ফোনের মাধ্যমে জানতে পারেন, তাঁর গবেষণাপত্রটি IEEE Best Paper Award-এর পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা প্রাইজমানি অর্জন করেছে। প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করতে না পারলেও পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হন তিনি।

তানভীরের এ অর্জনে অত্যন্ত আনন্দিত তাঁর একাডেমিক সুপারভাইজার ও EEE বিভাগের প্রভাষক মো. আমিমুল ইহসান। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে শিক্ষক হিসেবে তিনিও একই অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছিলেন।

নিজের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, শিক্ষার্থী হিসেবে জাবিপ্রবির জন্য এটি প্রথম এমন অর্জন এবং নিঃসন্দেহে এটি অত্যন্ত গর্বের বিষয়। তাঁর মতে, তানভীরের গবেষণার ধারণাটি ছিল অত্যন্ত চমৎকার।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একজন ভালো গবেষক হওয়ার জন্য শুরুতেই গবেষণামুখী মানসিকতা তৈরি করা প্রয়োজন। শুধু ভালো ফলাফল করার লক্ষ্য থাকলেই হবে না; গবেষণার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতাও থাকতে হবে।

তাঁর মতে, তানভীর জাবিপ্রবির অন্যান্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ। একটি বা দুটি সেমিস্টারে খারাপ ফলাফল করলেই কারও ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায় না।

তানভীরের গবেষণাটি সম্পূর্ণভাবে সিমুলেশননির্ভর হওয়ায় বাংলাদেশে এর সরাসরি ক্লিনিক্যাল প্রয়োগের সুযোগ বর্তমানে নেই। ভবিষ্যতে উন্নত ল্যাব সুবিধাসম্পন্ন দেশের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা চালিয়ে যেতে চান তিনি।

বিশেষ করে Biomedical Engineering, Computational Brain Stimulation এবং AI-based Healthcare Technology নিয়ে আরও কাজ করার আগ্রহ রয়েছে তাঁর।

Link copied!