প্রকাশিত: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম
বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার পর থেকেই রাত যেন আমার একান্তই আপন হয়ে গেছে। ঘুমের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে নিজের অজান্তেই। সারা রাত জেগে থাকি, কখনো ফোনের পর্দায় ডুবে, কখনো অদেখা চিন্তার ভিড়ে। দুপুরে ক্লাস, বিকেলে টিউশন, এই ছন্দহীন ছন্দেই কেটে যাচ্ছে দিনগুলো। বাইরে থেকে জীবনকে রঙিন মনে হলেও, ভেতরে কোথাও এক অদ্ভুত ক্লান্তি জমে থাকে। সেদিনও তার ব্যতিক্রম ছিল না। বিকেলের আলো তখন নরম হয়ে আসছে, আমি টিউশনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। আজ শনিবার বলে সব বাস আগে ভাগেই চলে গেছে, তাই বাধ্য হয়ে সিএনজিতে উঠতে হলো। পথের ভিড়ে বসে মনে পরছিলো,আগামীকাল ভাইভা, অসমাপ্ত অ্যাসাইনমেন্ট, আর একগুচ্ছ অগোছালো চিন্তা। ভবিষ্যতের হিসাব মেলাতে মেলাতে কখন যে কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশনের এক নম্বর রেলগেটে এসে পড়েছি, টেরই পাইনি। হঠাৎ সিএনজি থেমে গেল। সামনে সিগন্যাল। চালক বললেন,মামা অপেক্ষা করতে হবে ট্রেনের সিগনাল দিয়েছে । গন্তব্য খুব বেশি দূরে নয় ভেবে নেমে পড়লাম। বসে থাকার চেয়ে হেঁটে যাওয়াই সহজ মনে হইলো। রেললাইন পেরিয়ে প্ল্যাটফর্মে উঠতে যাবো, এমন সময় চোখ আটকে গেল এক দৃশ্যে। কালো বোরকা পরা এক মহিলা রেললাইনের ওপর নিশ্চুপ হয়ে বসে আছেন। আশেপাশে অনেক মানুষ কেউ তাকিয়ে আছে, কেউ ফিসফিস করছে কিন্তু কেউ এগিয়ে আসছে না। এই দিকে স্টেশন থেকে ট্রেন ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে, এই দৃশ্য দেখে আমি আর এক মুহূর্ত দেরি করিনি। দ্রুত লাইনে নেমে তাকে সরিয়ে আনলাম নিরাপদ জায়গায়। পাশে বসিয়ে বললাম, আন্টি, একটু শান্ত হয়ে বসুন।
তিনি কাঁপা কণ্ঠে বললেন, বাবা, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি চলে যাব। এরই মধ্যে ভিড় জমে গেল। কিন্তু কি অবাক কান্ড একটু আগেই যারা নিছক দর্শক ছিলো ঐ মানুষ গুলোই এখন উপদেশ দিতে শুরু করলো, যেন ঘটনাটা এখন তাদেরই দায়িত্ব। এই বৈপরীত্য আমাকে নিঃশব্দে আঘাত করলো। আমি অনুরোধ করে ভিড় সরালাম। একজন অপরিচিত মানুষ, খুব সম্ভবত ট্রাক ড্রাইভার হবে, সে আমাকে সাহায্য করলেন। চারপাশ একটু শান্ত হতেই আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আন্টি, কেন এমন করতে চাচ্ছিলেন?
কোনো উত্তর এল না। শুধু নিঃশব্দ প্রতিরোধ।
আমি আবার বললাম, মৃত্যু কি সত্যিই সব সমস্যার শেষ ? তিনি চুপ করে রইলেন । কিন্তু সেই নীরবতাই যেন অনেক কথা বলে দিচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর জানতে পারলাম, সারাদিন তিনি কিছু খাননি। খাবার এনে দিলাম, তবুও নিতে চাইছিলেন না।
সূর্য তখন অস্ত গেছে। আলো-আঁধারের মাঝে দাঁড়িয়ে বুঝলাম এই মুহূর্তে আমি শুধু একজন পথচারী নই, একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষ। তবু কোথাও একটা অদৃশ্য দূরত্ব রয়ে যাচ্ছিল। আমি বুঝলাম, আমার উপস্থিতি তাকে পুরোপুরি স্বস্তি দিচ্ছে না।একজন মেয়ে মানুষ দরকার, যে ভালোভাবে উনার সাথে মিশতে পারবে। তাই মুনতাহাকে ফোন করলাম।
সে দ্রুত চলে এলো। তার সহজ, কোমল কথায় মহিলার মুখ খুলতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে উঠে এলো তার জীবনের টুকরো টুকরো গল্প। একসময় জানালেন তার একমাত্র ছেলের, নাম রাফি। এই নামটা শুনে বুকের ভেতর কিছু একটা নড়ে উঠলো। মুনতাহা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাঁসি দিয়ে বললো তোর বন্ধু, একই নাম। আমি তার পাশে বসে বললাম, আন্টি, আমিও তো আপনার ছেলের মতোই। আমাদেরকে বলেন, আমরা চেষ্টা করি কিছু করার। এরপর আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না তিনি। কান্না ভেঙে পড়লেন।
আমি পরিবেশটা একটু হালকা করতে বললাম,চলেন, আজ আমরা আপনার বাসায় যাই। অনেক দিন আম্মুর হাতের রান্না খাই না । আপনার হাতের রান্না খাবো। অদ্ভুতভাবে, কথাটা কাজ করলো। তিনি রাজি হলেন।
কিন্তু সমস্যা রয়ে গেল, তিনি কোনো ফোন নম্বর মনে করতে পারছিলেন না। আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম। পুলিশের কাছে দেওয়া যায়, কিন্তু তাতে কি তিনি নিরাপদ বোধ করবেন?
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম নিজ দায়িত্বে পৌঁছে দেবো। বন্ধুদের ফোন করলাম। অনেকেই ব্যস্ততা দেখাল, কিন্তু কিছু মানুষ যাদের সঙ্গে খুব বেশি মেলামেশা ছিল না তারা এগিয়ে এলো। অপূর্ব, নাজমুল, ফাহিম সেদিন তারা শুধু বন্ধু নয়, সহযোদ্ধা হয়ে উঠেছিল। রাত নয়টার দিকে আমরা রওনা দিলাম। অচেনা পথ, অজানা গন্তব্য প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। রাত বাড়তে থাকলো, পথ শেষ হলো। অবশেষে পৌঁছালাম তার বাসায়।
সেখানে অপেক্ষা করছিল উদ্বিগ্ন একটি পরিবার। আমাদের দেখে তারা ছুটে এলো। তাকে ফিরে পেয়ে তাদের চোখে স্বস্তি, কৃতজ্ঞতা, আর না বলা ভয় একসঙ্গে মিশে ছিল। আমরা সব খুলে বললাম। পরামর্শ দিলাম তার পাশে থাকতে, তাকে বুঝতে। পরিবারের একজন বললেন, তোমরা না থাকলে আজ কী হতো, আল্লাহ ভালো জানেন। রাত তখন প্রায় বারোটা। বিদায় নিতে চাইলে তারা আমাদের থামালো। শেষ পর্যন্ত সামান্য কিছু খেয়ে আমরা রওনা দিলাম। ফেরার পথে ক্লান্তি শরীরকে গ্রাস করলো। কখন যে মুনতাহার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, জানি না। ঘুম ভাঙলো কুমিল্লার পরিচিত কোলাহলে। সেদিন বুঝেছিলাম, জীবনের অচেনা পথেই হঠাৎ করে এসে দাঁড়ায় সবচেয়ে অমূল্য দায়িত্ব।
