রবিবার ০৭, জুন ২০২৬

রবিবার ০৭, জুন ২০২৬ -- : -- --

একান্নবর্তী পরিবারের জীবন্ত ইতিহাস মৌলভীবাজারে

মৌলভীবাজার থেকে রাজন হোসেন তৌফিক

প্রকাশিত: ০৬ জুন ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম

সংগৃহীত ছবি

প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই ধোঁয়া উঠতে শুরু করে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার বিনন্দপুর গ্রামের একটি মাটির রান্নাঘর থেকে। আশপাশের মানুষের কাছে এটি একটি পরিচিত দৃশ্য। কারণ প্রায় আট দশক ধরে একই চুলায় জ্বলছে আগুন, আর সেই চুলাতেই রান্না হচ্ছে একটি পরিবারের অর্ধশত সদস্যের খাবার।

যেখানে আধুনিক সমাজে যৌথ পরিবারের ধারণা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে একক পরিবারের দিকে ঝুঁকছে, সেখানে পূর্ব জুড়ী ইউনিয়নের বিনন্দপুর গ্রামের রুদ্রপাল পরিবার আজও ধরে রেখেছে একান্নবর্তী পরিবারের বিরল ঐতিহ্য। নয় ভাই, তাদের স্ত্রী-সন্তান ও নাতি-নাতনিসহ প্রায় ৫০ সদস্যের এই পরিবার একই ছাদের নিচে বসবাস করছে দীর্ঘদিন ধরে।

গ্রামের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে শান্ত একটি পুকুর, তার চারপাশে ফলদ বৃক্ষ, ফুলের বাগান ও মৌসুমি সবজির চাষ। টিনের চালার কয়েকটি ঘরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি বড় উঠান। সেই উঠানের একপাশে খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির রান্নাঘর, যেখানে প্রতিদিন পরিবারের সবার জন্য রান্না হয় একই হাঁড়িতে।

স্থানীয়দের কাছেও পরিবারটি অনন্য উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। পূর্ব জুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “আশপাশের এলাকায় এমন পরিবার আর নেই। বিনন্দপুর দিয়ে গেলে আমি প্রায়ই তাদের বাড়িতে যাই। এই পরিবার আমাদের গর্ব।”

রুদ্রপাল পরিবারের ইতিহাসও বেশ চমকপ্রদ। পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ভীম রুদ্রপাল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলা থেকে ব্রিটিশ আমলে কাজের সন্ধানে তৎকালীন পূর্ববাংলায় আসেন। তিনি ধামাই চা বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে দেশভাগের আগে বিনন্দপুর পাহাড় এলাকায় অল্প দামে জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলেন। সেই ছোট্ট উদ্যোগই আজ পরিণত হয়েছে বিশাল এক পরিবারে।

ভীম রুদ্রপাল এবং তার দুই ছেলে মুরারি ও কেশব রুদ্রপাল আজ আর বেঁচে নেই। তবে তাদের রেখে যাওয়া পারিবারিক ঐক্যের বন্ধন অটুট রয়েছে। মুরারি ও কেশবের নয় ছেলেকে ঘিরেই বিস্তৃত হয়েছে বর্তমান রুদ্রপাল পরিবার।

বর্তমানে পরিবারের নেতৃত্বে রয়েছেন মুরারি রুদ্রপালের জ্যেষ্ঠ পুত্র পলাশ রুদ্রপাল। প্রায় ৬০ বছর বয়সী পলাশ পরিবারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছেন।

পলাশ রুদ্রপাল বলেন, “বাবা-কাকার সময় থেকেই আমরা একসঙ্গে আছি। এখনও একই হাঁড়িতে রান্না হয়, সবাই একসঙ্গে খাই। আলাদা হওয়ার কথা কখনও ভাবিনি।”

পরিবারের বড় বধূ নীলিমা রুদ্রপাল জানান, “তিন পালায় তিনবেলা রান্না হয়। সবাই যার যার দায়িত্ব পালন করে। কাজ নিয়ে বা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ হয় না বললেই চলে।”

প্রবীণ সদস্য সোহাগী রুদ্রপাল বলেন, “ছেলে, বউমা আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে ভালোই আছি। ভগবানের কাছে শুধু এই প্রার্থনা করি, সবাই যেন সবসময় এভাবেই একসঙ্গে থাকে।”

পারিবারিক ঐক্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাও এই পরিবারের শক্তির অন্যতম ভিত্তি। সদস্যরা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। নয় ভাইয়ের মধ্যে একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, একজন বেসরকারি চাকরিজীবী, একজন গ্রাম্য পশুচিকিৎসক এবং একজন প্রবাসী। অন্যরা কৃষিকাজ ও পারিবারিক সম্পদ দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন।

স্থানীয় দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অশোক রঞ্জন রুদ্রপাল বলেন, “একটি পরিবার যখন ঐক্যবদ্ধ থাকে, তখন সদস্যরা একে অপরের কাছ থেকে শক্তি ও সাহস পায়। নতুন প্রজন্ম শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার শিক্ষা পায়। রুদ্রপাল পরিবার সেই উদাহরণই তৈরি করেছে।”

সময়ের সঙ্গে বদলেছে সমাজ, বদলেছে পারিবারিক কাঠামো। কিন্তু বিনন্দপুরের রুদ্রপাল পরিবার এখনও ধরে রেখেছে একসঙ্গে থাকার সেই চর্চা, যা এখন বিরল। উঠান, পুকুর, গাছপালা আর মাটির রান্নাঘর যেন আজও সাক্ষ্য দেয় একটি পরিবারের অটুট বন্ধনের।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় যখন সেই রান্নাঘরের চুলায় আগুন জ্বলে ওঠে, তখন ধোঁয়ার সঙ্গে ভেসে ওঠে আশি বছরের এক গল্প—এক চুলা, পঞ্চাশ মুখ আর ভালোবাসা, ত্যাগ ও ঐক্যে গড়া এক অমলিন সংসারের গল্প।

Link copied!