প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০২ পিএম
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের দুটি শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন চারটি পাঠ্যবই। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, নৈতিক মূল্যবোধ, সৃজনশীল চিন্তাশক্তি এবং বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বইগুলো প্রণয়ন করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
বইগুলো হলো চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’।
এনসিটিবি সংশ্লিষ্টদের মতে, মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনার বাইরে শিক্ষার্থীদের আনন্দময়, জীবনমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতেই নতুন বইগুলো যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা ও নির্দেশনার আলোকে নতুন চারটি পাঠ্যবই প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের অংশ হিসেবে নতুন বইগুলো যুক্ত করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি গড়ে তোলার পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে গুরুত্ব দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে এনসিটিবির একটি দল গঠন করা হয়েছে। দলটিতে নীতিমালা প্রণয়নে সহযোগিতাকারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাবিদদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা ধারাবাহিক আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে কাজ করছেন।
এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আনন্দ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও হাতে-কলমে কারিগরি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয়ে বইগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভায় বইগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে।
এনসিটিবি জানিয়েছে, চারটি বইয়ের প্রায় দেড় কোটি কপি মুদ্রণ করা হবে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যবইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ২৫ অক্টোবর এনসিসির সভায় অনুমোদনের পর বইগুলোর বিষয়বস্তু মুদ্রণের জন্য ছাপাখানায় পাঠানো হবে।
এনসিটিবি জানায়, গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু বলেন, নতুন চারটি বই মুদ্রণের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এনসিসির অনুমোদন পেলে আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি কপি বই মুদ্রণের কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’: সুস্থ জীবনধারা ও আত্মরক্ষার কৌশল
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিক বিকাশ বিবেচনায় ১৪টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে ‘খেলাধুলা’ বইটি। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সুস্থ জীবনধারা ও ক্রীড়াচর্চায় আগ্রহী করে তোলাই এর অন্যতম লক্ষ্য।
বইটিতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলার মৌলিক নিয়ম তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খেলার মাঠে বা দৌড়ানোর সময় কেটে যাওয়া, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া কিংবা হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিতে করণীয়ও ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবহার ও আঘাত প্রতিরোধের কৌশল সম্পর্কে জানতে পারবে।
খেলাধুলার পাশাপাশি পুষ্টি, সামাজিক দক্ষতা ও দেশপ্রেমের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বইটিতে।
প্রস্তাবিত বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে ‘স্বপ্ন যখন আকাশছোঁয়া’ শিরোনামে একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প রয়েছে। এতে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আয়মান স্যার ও তাঁর সহকর্মী সাদিয়া আপার উদ্যোগে মেয়েদের ফুটবল দল গঠনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। সামাজিক বাধা ও কুসংস্কার পেরিয়ে মেহজাবিনসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীর ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় অতিক্রম করে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জনের কাহিনির মাধ্যমে খেলাধুলার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যাতে একমুখী ও ক্লান্তিকর না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রেখে প্রথমবারের মতো ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’: ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের পরিচয়
দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করতে ১১টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে চতুর্থ শ্রেণির ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইটি।
এতে ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যসংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা বর্ণিল চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
বইটিতে বাংলা বর্ণমালা চর্চা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং পিঠাপুলির আয়োজনের পাশাপাশি মা-বাবার যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস, ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এবং প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের দুর্লভ ছবি যুক্ত করা হয়েছে।
‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’: ভীতিমুক্ত ও আনন্দময় শিক্ষা
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ছয়টি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি। পড়াশোনাকে ভীতিমুক্ত ও আনন্দদায়ক করে তোলাই বইটির মূল লক্ষ্য।
প্রচলিত পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষার পরিবর্তে আনন্দময় অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে কীভাবে জ্ঞান অর্জন করা যায়, তা বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যভার কমানোর পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে শেখার সম্পর্ক তৈরি করা হবে।
এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানান, বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারবে, শেখা শুধু মুখস্থ করা বা পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের জীবন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকেও জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব।
‘আমার কারিগরি শিক্ষা’: হাতে-কলমে দক্ষতা অর্জন
একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার অভ্যাস ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বাড়াতে ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটি আটটি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা শুধু কী জানে, তা নয়; বরং বাস্তবে কী করতে পারে, সে বিষয়ে দক্ষ করে তোলাই বইটির মূল লক্ষ্য।
এতে কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি, নতুন বিশ্ব, ছোট উদ্যোগের সম্ভাবনা, উদ্ভাবন, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপনের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাস্তব জীবনের বিভিন্ন কারিগরি সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রযুক্তির সহায়তায় সেগুলোর মৌলিক সমাধান খুঁজে বের করার ধারণাও এতে তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া চারটি নতুন বইয়েই শব্দকোষের মতো বিশেষ অংশ যুক্ত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, চতুর্থ শ্রেণিতে চালু হতে যাওয়া খেলাধুলা ও সংস্কৃতিবিষয়ক বই পরবর্তী সময়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম শওকত আলী খান বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যবই চালু হলে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে আনন্দময় পরিবেশে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।
