শুক্রবার ২৩, অক্টোবর ২০২৬

শুক্রবার ২৩, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --

এলডিসি উত্তরণের দোরগোড়ায়: ভারত-চীন সমীকরণে অর্থনৈতিক কূটনীতি

আব্দুল্লাহ আর রাফি,গোবিপ্রবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম

এআই জেনারেটেড ও ক্যাম্পাস রিপোর্ট কোলাজ

কল্পনা করুন, নভেম্বরের এক কুয়াশাঢাকা ভোর। গাজীপুরের এক পোশাক কারখানার মালিক অফিসঘরে একা বসে হিসাব মেলাচ্ছেন। টেবিলে ইউরোপের এক ক্রেতার নতুন অর্ডারের প্রস্তাব, পাশের ফাইলে ভিয়েতনামের এক প্রতিযোগীর দর। তাঁর মাথায় ঘুরছে একটিই প্রশ্ন: আগামী বছরও কি এই দামে মাল পাঠানো যাবে? এই মালিক কাল্পনিক, কিন্তু তাঁর দুশ্চিন্তা মোটেই কাল্পনিক নয়।

এই দুশ্চিন্তার নাম এলডিসি উত্তরণ। এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ; জাতিসংঘের মানদণ্ডে যেসব দেশ দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক দুর্বলতায় পিছিয়ে এবং বিশেষ বাণিজ্যসুবিধা পায়) তালিকায় বাংলাদেশ আছে ১৯৭৫ সাল থেকে। সেই তালিকা ছাড়ার নির্ধারিত তারিখ ২৪ নভেম্বর ২০২৬, যা এখন মাত্র কয়েক সপ্তাহ দূরে। অথচ উদযাপনের বদলে ঢাকার কূটনীতি এখন ব্যস্ত উল্টো কাজে: জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর সমর্থন চেয়ে যাত্রাটি আরও তিন বছর পিছিয়ে দিতে।

প্রশ্ন তাই একটাই: উত্তরণ যখন দোরগোড়ায়, তখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি কোন পথে হাঁটবে? ভারত বা চীন, একটিকে বেছে নেওয়ার পথে, নাকি দুজনের সঙ্গেই স্বার্থভিত্তিক দর-কষাকষির পথে? আমার বক্তব্য, দ্বিতীয় পথই বাস্তবসম্মত, আর তার সঙ্গে দরকার ভারত-চীনের বাইরে তৃতীয় একটি বাজারের পথও খুলে রাখা।

ঘড়ির কাঁটায় উত্তরণ
গল্পটা শুরু ২০২১ সালে। সে বছরের ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশ, নেপাল ও লাওসের উত্তরণের প্রস্তাব গ্রহণ করে। সাধারণত প্রস্তুতিকাল তিন বছর হলেও কোভিডের ক্ষতি সামলাতে এই তিন দেশকে দেওয়া হয় পাঁচ বছর। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনাতেই উত্তরণের তিনটি মানদণ্ড পূরণ করেছিল: মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক।

কিন্তু সরকারের ভাষ্য, সেই পাঁচ বছর কেটেছে মূলত সংকট সামলাতে। তাই ১৮ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটিকে (সিডিপি; যে কমিটি সুপারিশ করে কোন দেশ এলডিসি থেকে বের হবে) চিঠি দিয়ে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর, অর্থাৎ ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানান। এপ্রিলের শুরুতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ মহাসচিবকে চিঠি লিখে এ বিষয়ে ব্যক্তিগত সমর্থন চান। ২ জুন অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, সিডিপি এই অনুরোধের পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। তবে একই সঙ্গে সতর্কবার্তাও আছে: যে দেশ মানদণ্ড ভালো ব্যবধানে পূরণ করেছে, তার এলডিসিতে থাকা দীর্ঘায়িত হলে উত্তরণের সুফল পেতেও দেরি হতে পারে। ২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ ঐকমত্যের ভিত্তিতে সাধারণ পরিষদকে ২৪ নভেম্বরের আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সুপারিশ করে। ২০২১ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে নেপাল ও লাওসের উত্তরণও সুপারিশ করা হয়েছিল; নেপালও এখন সাড়ে দুই বছরের স্থগিতাদেশ চেয়ে আবেদন করেছে, অর্থাৎ ঢাকা একা নয়। তবে সিদ্ধান্তের চাবি শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের হাতে।

এখন সিদ্ধান্ত সাধারণ পরিষদের হাতে। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী পরিষদের দ্বিতীয় কমিটির অধিবেশন চলছে ১ অক্টোবর থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত, আর বাংলাদেশ ও নেপালের বিষয়ে সুপারিশ আলোচনার কথা ছিল ৭ অক্টোবর। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে সদস্য দেশগুলোর ভোটে, এবং তার জন্য সময় বাকি আছে মাত্র কয়েক সপ্তাহ।

এখানে একটি সূক্ষ্ম কথা আছে। সিডিপির মূল্যায়নে বাংলাদেশ মানদণ্ড পূরণ করেছে; সমস্যা যোগ্যতার নয়, প্রস্তুতির। কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী বাড়তি সময় দেওয়া তখনই প্রশংসনীয় হবে, যদি এ সময়ে কাঠামোগত দুর্বলতা কাটাতে জরুরি সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। সংস্কারের তালিকায় আছে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, করের আয় বাড়ানো, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং বেসরকারি খাতকে প্রস্তুত করা। অর্থাৎ তারিখ পিছোলে কাজ কমে না, বরং কাজের জবাবদিহি জুড়ে যায়।

যে ছাতা সরে যাচ্ছে
উত্তরণে ঠিক কী হারানোর ভয়? রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রধান সুবিধাটি হলো শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার। গবেষণা সংস্থা র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাকের হিসাবে কানাডা, চীন, ভারত ও জাপানসহ বেশির ভাগ দেশে উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গেই এলডিসি-সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে; শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্য আরও তিন বছরের ক্রান্তিকাল দেয়। বিভিন্ন গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছে, এই সুবিধা হারালে বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ রপ্তানির ১৪ শতাংশ পর্যন্ত খোয়া যেতে পারে।

ঝুঁকির আকার বুঝতে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাবই যথেষ্ট। ওই বছর তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলারের, যা আগের বছরের চেয়ে ১.৬৪ শতাংশ কম; এই খাতই দেশের মোট পণ্য রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি। ইইউতে গেছে ১৯.০৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক, অর্থাৎ মোট পোশাক রপ্তানির ৪৯.২৫ শতাংশ; আগের বছর এই অংশ ছিল ৫০.১০ শতাংশ, আর এ বছর এই বাজারে রপ্তানি কমেছে ৩.৩১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি ২.৬৩ শতাংশ বেড়ে ৭.৭৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা মিলিয়ে অংশ ৩৫ শতাংশের বেশি। সব পণ্য মিলিয়ে প্রাথমিক হিসাবে রপ্তানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের চেয়ে ০.৫৮ শতাংশ কম এবং সরকারের ৫৫ বিলিয়নের লক্ষ্যের অনেক নিচে।

অথচ প্রতিযোগীরা বসে নেই। র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান রাজ্জাকের ভাষ্য, ইইউ-ভিয়েতনাম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ; দুই পক্ষ পরস্পরের পণ্যে শুল্ক কমানো বা তুলে নেওয়ার চুক্তি) আওতায় ভিয়েতনামের পণ্যের ওপর ইইউর শুল্ক ধাপে ধাপে কমে ২০২৭ সালের মধ্যে শূন্যে নামার কথা। নিট পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলী শামীম এহসানের মতে, আগামী জানুয়ারি থেকে ভারত ও ভিয়েতনাম নিজ নিজ চুক্তির আওতায় ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত পণ্য পাঠাতে পারবে; এখন ভারতীয় পণ্যকে সেখানে প্রায় ১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। র‍্যাপিডের এক গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিযোগীরা শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে আর বাংলাদেশের সুবিধা সরে গেলে ইইউতে পোশাক রপ্তানি ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। বাংলাদেশের নিজস্ব এফটিএ থাকলে সেই পতন ১৯ শতাংশে সীমিত রাখা সম্ভব। অর্থাৎ ঝুঁকি আসছে দুই দিক থেকে: আমাদের সুবিধা কমছে, প্রতিযোগীর সুবিধা বাড়ছে।

আমাদের সেই কারখানা মালিকের ভয় তাই অমূলক নয়: ভিয়েতনামের দর কমছে, অথচ আমাদের ছাতা সরছে।

ভারত ও চীন: দুই পাল্লার হিসাব
এই ঝুঁকির মধ্যে ভারত কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানি উৎস এবং শিল্পের কাঁচামালের বড় জোগানদার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ১০.৯৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, আর ভারতে রপ্তানি ১.৭৫ বিলিয়ন ডলারের। সুতা আমদানির উদাহরণ আরও পরিষ্কার: ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মোট প্রায় ৭২০ মিলিয়ন কেজি সুতা আমদানির ৪৭ শতাংশ এসেছে ভারত থেকে, চীন থেকে ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ আমাদের কারখানার চাকা ঘোরে দুই প্রতিবেশীর কাঁচামালেই।

কাঁচামালের এই নির্ভরতা শুধু সুতায় থেমে নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ৯.৯ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৮.৪৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সুতা ৩.৬১ বিলিয়ন, কাঁচা তুলা ৩.৪৬ বিলিয়ন এবং কাপড়সহ বস্ত্রজাত সামগ্রী ৮.৬৯ বিলিয়ন ডলার। দেশে তুলা উৎপাদন বছরে মাত্র ১ লাখ ৫৩ হাজার গাঁট, যা চাহিদার ২ শতাংশেরও কম। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি দপ্তরের (ইউএসডিএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪-২৫ বিপণন বছরে ব্রাজিল ভারতকে ছাড়িয়ে তুলার প্রধান সরবরাহকারী হয়েছে। সুতায় ভারত বড় জোগানদার, কারণ তার স্পিনিং শিল্প বড়, জাহাজযোগে সময় কম লাগে আর পরিবহন খরচও কম; কাপড়ে শীর্ষে চীন, তারপর পাকিস্তান ও ভারত। একটি বাণিজ্যসংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪ সালে কাপড় আমদানির প্রায় ৭৮ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। অর্থাৎ সুতা মূলত ভারতের, কাপড় মূলত চীনের, তুলা ব্রাজিল, পশ্চিম আফ্রিকা, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের। আমাদের রপ্তানি-সাফল্যের পেছনে আছে এক বিশ্বজোড়া সরবরাহ শৃঙ্খল।

এই বাস্তবতায় ৮ ও ৯ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে বসেছিল বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাণিজ্য কর্মগোষ্ঠীর (যে ফোরামে দুই দেশের কর্মকর্তারা বাণিজ্যবাধা নিয়ে আলোচনা করেন) ১৬তম বৈঠক। ১৫তম বৈঠক হয়েছিল ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায়; ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্যে ফোরামটি আর বসেনি। এবার বাংলাদেশ দাবি তুলেছে স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের; পাট ও পিইটি ফিল্মের ওপর বসানো অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক (সস্তা দামের আমদানি ঠেকাতে বাড়তি শুল্ক) তোলার; উত্তরণের পরও শুল্কসুবিধা অব্যাহত রাখার; এবং নেপাল ও ভুটানে পণ্য নিতে ভারতের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট (এক দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে পণ্য পরিবহনের সুযোগ) সুবিধার।

কিন্তু দর-কষাকষি একতরফা নয়। ভারতের পক্ষ থেকে উঠেছে কয়েকটি স্থলবন্দর দিয়ে সুতা ও অন্য পণ্য আমদানির বিধিনিষেধ তোলার প্রশ্ন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর রপ্তানির বাধা, পণ্যের মানদণ্ড এবং বাণিজ্যে রেল ও অভ্যন্তরীণ নৌপথের ব্যবহার বাড়ানো। পটভূমিটাও মনে রাখা দরকার: ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ পাঁচটি স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধ করে, আর এরপর ভারতও বাংলাদেশি তৈরি পোশাকসহ কয়েকটি পণ্যের স্থলবন্দর-প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়। অর্থাৎ বিধিনিষেধের এই বেড়া দুই পক্ষই তুলেছে। একপক্ষ সুবিধা চাইবে আর অন্যপক্ষ কিছুই পাবে না, এমন সম্পর্ক টেকে না। তাই ঢাকার উচিত শুল্কসুবিধা, স্থলবন্দর, অশুল্ক বাধা (শুল্ক ছাড়া অন্য নিয়মকানুন বা মানদণ্ড, যা আমদানি-রপ্তানি কঠিন করে) ও ট্রানজিটকে আলাদা আলাদা না তুলে একটি প্যাকেজ হিসেবে সাজানো।

এই সম্পর্কের ঘরোয়া দিকটিও কম জটিল নয়। ইউএসডিএ-র তথ্য অনুযায়ী দেশের বস্ত্র শিল্পের ক্ষমতা বছরে প্রায় ১.৫ কোটি গাঁট তুলা ব্যবহারের, কিন্তু ব্যবহার হচ্ছে অর্ধেকের মতো। আর রপ্তানি আদেশ কমায় দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার অবিক্রীত সুতার স্তূপে চাপে আছে বলে এ বছর ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন মহিউদ্দিন রুবেল। অর্থাৎ ভারতীয় সুতার প্রশ্নে ঢাকার নিজের ভেতরেই দুই স্বার্থ: দেশীয় স্পিনারদের সুরক্ষা আর পোশাক কারখানার জন্য সস্তা কাঁচামাল। ভারতের সঙ্গে প্যাকেজ আলোচনায় বসার আগে এই ঘরোয়া হিসাবও মেলাতে হবে।

চীনের দিকের ছবিটা এসেছে মোংলা বন্দরে। ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের জন্য ২.৪০৪ বিলিয়ন ইউয়ানের, অর্থাৎ ৩৩৫.৭৮ মিলিয়ন ডলার বা ৩ হাজার ৫৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকার ঋণচুক্তি সই করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ঋণের সুদ ২ শতাংশ, মেয়াদ ২০ বছর, যার মধ্যে পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড (ঋণ পরিশোধ শুরুর আগের ছাড়ের সময়)। এই অর্থে তৈরি হবে দুটি কনটেইনার টার্মিনাল, কনটেইনার ইয়ার্ড, ডেলিভারি ইয়ার্ড ও কার্গো হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড; মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ কাজ শেষ করতে চায় ২০২৮ সালের ডিসেম্বরে। প্রতিবেদন অনুযায়ী চুক্তিটি প্রধানমন্ত্রীর জুনের বেইজিং সফরের সমঝোতার ধারাবাহিকতা।

ভূরাজনীতির কারণেই এই চুক্তি নিয়ে আগ্রহ বেশি, কারণ মোংলা ভারতীয় সীমান্ত থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে। প্রায় এক বছর আগে অন্তর্বর্তী সরকার মোংলার কাছে ১১০ একর জমিতে প্রস্তাবিত ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল বাতিল করেছিল, কারণ ভারতের মনোনীত ডেভেলপার নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শুরু করতে পারেনি; ২০১৫ সালের দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের আওতায় ওই জমি ভারতের জন্য নির্ধারিত ছিল। এ বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের সময় সেই একই জমিতে একটি চীনা-উন্নত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। তবে ভারত মোংলায় একেবারে অনুপস্থিত নয়: একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারতীয় এক্সিম ব্যাংকের প্রায় ৫৩০ মিলিয়ন ডলারের ঋণসহায়তায় সেখানে আলাদা একটি সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্প রয়েছে।

তাহলে ঋণফাঁদের (ঋণ শোধে ব্যর্থ হয়ে ঋণদাতার ওপর কৌশলগত নির্ভরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি) আশঙ্কা কতটা বাস্তব? এর উত্তর শুধু সুদের হারে নেই, আছে প্রকল্পের অর্থনীতিতে। ২ শতাংশ সুদ আর ২০ বছরের মেয়াদ নিঃসন্দেহে সহজ শর্ত; অর্থ বিভাগও একে ছাড়ের (কনসেশনাল) ঋণ বলছে। কিন্তু চুক্তির অঙ্ক ইউয়ানে নির্ধারিত, ফলে বিনিময় হারের ঝুঁকি থাকে। আরও বড় প্রশ্ন, নতুন টার্মিনাল পর্যাপ্ত কনটেইনার ও আয় টানতে পারবে কি না। অর্থাৎ ঋণ নেওয়া দোষের নয়; দোষ হবে প্রকল্পের যৌক্তিকতা যাচাই না করে, শর্ত জনসমক্ষে না এনে ঋণ নেওয়া।

একটি দাঁড়িপাল্লার কথা ভাবুন। এক পাল্লায় ভারত: কাছের বাজার, স্থলপথের সংযোগ, ট্রানজিট আর কাঁচামালের জোগান। অন্য পাল্লায় চীন: অবকাঠামোর অর্থায়ন আর সুতার মতো কাঁচামালের দ্বিতীয় উৎস। বাংলাদেশের কাজ কোনো এক পাল্লা ফেলে দেওয়া নয়; কাজ হলো দুই পাল্লা এমনভাবে সাজানো, যাতে কাঁটা নিজের স্বার্থের দিকে স্থির থাকে। এর পক্ষে যুক্তি তিনটি। প্রথমত ভূগোল ও বাণিজ্যের নির্ভরতা: ভারতকে এড়ানোর সুযোগ আমাদের নেই। দ্বিতীয়ত অর্থায়ন: নিজস্ব রাজস্ব সীমিত, আর এলডিসি সুবিধা কমলে সহজ শর্তের ঋণও কমবে; তাই সহজ শর্তে অর্থায়ন যেখানে মেলে, সেখানে দরজা খোলা রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। তৃতীয়ত দর-কষাকষির ক্ষমতা: একজনের ওপর নির্ভরতা মানে অন্যজনের কাছে আমাদের দাম কমে যাওয়া।

সরকারও প্রকাশ্যে এই সুরেই কথা বলেছে। ফেব্রুয়ারিতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছিলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের ভিত্তিতে চলবে এবং কোনো বিশেষ দেশের ওপর অতিনির্ভরতা থেকে সরে আসবে। বিপক্ষে একটি জোরালো আপত্তি অবশ্য আছে: দুই শক্তির টানাপোড়েনে ছোট দেশ দুই দিকেই ঝুঁকলে শেষে কারও আস্থা পায় না। এই ঝুঁকি অস্বীকার করার উপায় নেই। আমার জবাব, ভারসাম্য মানে ঝোঁক নয়, নিয়ম। প্রতিটি চুক্তি ও প্রকল্প একই মানদণ্ডে যাচাই হবে: খরচ কত, আয় কত, শর্ত কী, দেশের লাভ কী। মোংলায় চীনা ঋণ আর ভারতীয় অর্থায়ন পাশাপাশি থাকলে সেটিই হতে পারে নিয়মভিত্তিক ভারসাম্যের উদাহরণ, যদি দুই পক্ষের প্রস্তাবই একই কঠোরতায় ও স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা হয়।

তৃতীয় পাল্লা: বাজার বৈচিত্র্য ও করণীয়
ভারত-চীন সমীকরণ আসলে বড় ছবির একটি অংশ। উত্তরণের ধাক্কা সামলাতে দরকার তৃতীয় একটি পাল্লাও: বিভিন্ন বাজারে নিরাপদ প্রবেশাধিকার। এ কাজে ঢাকা তৎপর। মার্চে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ইইউর বাণিজ্য কমিশনারকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরুর অনুরোধ জানিয়েছেন। কমিশনার উত্তরণের সময় বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছেন, তবে এফটিএ-র প্রশ্নে বলেছেন ইইউ নিজস্ব প্রক্রিয়ায় বিষয়টি মূল্যায়ন করবে; শ্রম পরিস্থিতি নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। বাণিজ্যমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী ইইউর তোলা ৪৮টি অশুল্ক বাধার সুরাহা হয়েছে, আরও ১৩টি পর্যালোচনায় আছে। অক্টোবরেই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ইইউ-এফটিএ ও এলডিসি উত্তরণ নিয়ে আলোচনা করেছেন, আর বাণিজ্যমন্ত্রী সফররত ডাচ বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতামন্ত্রীর কাছে এফটিএ-র কারিগরি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া ও অশুল্ক বাধা সরানোর ওপর জোর দিয়েছেন।

ইইউর বাজারের হিসাবটা আসলে দুই ধাপের। প্রথম ধাপে উত্তরণের পর তিন বছরের ক্রান্তিকাল: ইইউ এই সময়ে, অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত, বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল রাখছে। এরপর কোনো ব্যবস্থা না থাকলে বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমানের হিসাবে বাংলাদেশি পণ্যকে প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে দুটি পথ: জিএসপি-প্লাস (ইইউর বিশেষ সুবিধা, যেখানে মানবাধিকার, শ্রম ও পরিবেশসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন বাস্তবায়নের শর্তে শুল্কমুক্ত প্রবেশ মেলে) অথবা এফটিএ। জিএসপি-প্লাসের জন্য ৩২টি কনভেনশন অনুসমর্থন করতে হয়। ২০২৫ সালে ডেইলি স্টারকে বাণিজ্যসচিব জানান, বেশির ভাগে সই থাকলেও চার-পাঁচটি অনুসমর্থন কঠিন, কারণ শর্ত কড়া। জিএসপি-কাঠামোর একটি নিয়মে কোনো দেশের অংশ ৩৭ শতাংশ ছাড়ালে সুবিধা স্থগিত হতে পারে; ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী পোশাকে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এ কারণেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এফটিএকে বেশি বাস্তবসম্মত মনে করছে, যেখানে পণ্য, সেবা ও রুলস অব অরিজিন (কোন পণ্য কতটা দেশীয় হলে সুবিধা পাবে, সেই নিয়ম) যৌথভাবে দর-কষাকষি করা যায়। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত প্রবেশের শর্ত ২৫ শতাংশ দেশীয় মূল্যসংযোজন, অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ; আমদানি করা কাঁচামালনির্ভর পোশাক খাতের জন্য এই শর্তও সহজ নয়।

আরসিইপিতে (এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চলের বৃহৎ বাণিজ্যজোট) যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়াতেও বাংলাদেশ আছে। র‍্যাপিডের চেয়ারম্যানের মতে, অনুমোদিত হলে এটি বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যজোটে প্রবেশাধিকার দেবে।

এখানে আরেকটি অস্বস্তিকর তথ্য আছে। বাণিজ্যসচিবের ভাষ্য, ভারত ও ভিয়েতনাম ইতিমধ্যে ইইউর সঙ্গে এফটিএ সই করেছে। অথচ এত বছর বাংলাদেশের হাতে ছিল কেবল ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর ভুটানের সঙ্গে পিটিএ (প্রেফারেন্সিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট; নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে শুল্কছাড়ের চুক্তি), যার আওতায় বাণিজ্য মাত্র প্রায় ২২ মিলিয়ন ডলারের। অর্থাৎ এত বছর আমরা জাতিসংঘের মানদণ্ডে বিশেষ সুবিধা পেয়েছি, কিন্তু নিজের দর-কষাকষির চুক্তি গড়ে তুলিনি। এ বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে জাপানের সঙ্গে সই হওয়া প্রথম ইপিএ (অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি; শুল্কছাড়ের পাশাপাশি সেবা ও বিনিয়োগও যার আওতায়) তাই একটি মোড়। বাণিজ্যসচিবের ভাষায়, এটি কোনো উন্নত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ চুক্তি। এতে বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, বিপরীতে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে জাপানের ১ হাজার ৩৯টি পণ্যে শুল্কছাড় দেবে। তবে বাস্তবতাটাও মনে রাখা দরকার: জাপানসহ সব অপ্রচলিত বাজারে আমাদের মোট পোশাক রপ্তানি ৬.১৬ বিলিয়ন ডলার, আর ইইউতে ১৯.০৬ বিলিয়ন। অর্থাৎ জাপানের চুক্তি প্রমাণ করে আমরা পারি, কিন্তু আসল পরীক্ষা এই অভিজ্ঞতাকে ইইউর টেবিলে নিয়ে যাওয়া। ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাই শুধু শুল্কের হিসাব নয়, দর-কষাকষির অভিজ্ঞতার ঘাটতিও আছে। আর সেই ঘাটতি মেটাতে ঘরের ভেতরের কাজও সারতে হবে: ইইউর রাষ্ট্রদূত ইঙ্গিত দিয়েছেন, এফটিএ আলোচনা শুরুর আগে অশুল্ক বাধা, শ্রম অধিকার ও ব্যবসার পরিবেশে সংস্কার দ্রুত করতে হবে।

বাজারের পাশাপাশি দরকার পণ্যের বৈচিত্র্য। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ৭.০৯ শতাংশ বেড়ে ১.২৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে; পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৭.৭৫ শতাংশ, হোম টেক্সটাইলের ৬.৫২ শতাংশ আর প্রকৌশল পণ্যের ২১.৭৭ শতাংশ। অঙ্কগুলো এখনো ছোট, কিন্তু দিক ঠিক। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, ইইউ বাজারে রপ্তানি বাড়াতে হলেও পণ্যের ধরন বাড়ানো দরকার।

তাহলে করণীয় কী? প্রথমত, উত্তরণের বাড়তি সময়কে সংস্কারের সময়ে পরিণত করা। সিডিপি যেসব ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে, অর্থাৎ আর্থিক খাত, রাজস্ব আদায় ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, সেগুলোর জন্য সময়সীমাসহ কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা দরকার। দ্বিতীয়ত, এক কণ্ঠে কথা বলা: পররাষ্ট্র, বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত দাবি, যা দিল্লি, বেইজিং ও ব্রাসেলসের টেবিলে একই সুরে বাজবে। তৃতীয়ত, ভারতের সঙ্গে প্যাকেজ আলোচনা করা, আর চীনসহ সব ঋণের শর্ত জনসমক্ষে আনা। চতুর্থত, ইইউ-এফটিএ ও আরসিইপি আলোচনা জোরদার করা এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার বাজার ধরে রাখা। আর পঞ্চমত, পোশাকের বাইরে নতুন পণ্যের জন্য নীতিসহায়তা ও দক্ষতা-উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো।

ফিরে যাই গাজীপুরের সেই কারখানা মালিকের কাছে। তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিল্লি বা বেইজিং দেবে না; দেবে ঢাকার সিদ্ধান্ত। উত্তরণ ২০২৬-এ হোক বা ২০২৯-এ, তারিখ বদলায়, কিন্তু প্রশ্ন বদলায় না: শুল্কসুবিধার ছাতা সরে গেলে আমরা কিসের জোরে দাঁড়াব? উত্তরণ কোনো সমাপ্তি নয়, কূটনীতির নতুন পরীক্ষার শুরু। সেই পরীক্ষায় পাস করার সূত্র একটাই: কাউকে ছাড়ব না, কারও ওপর ঝুঁকব না, আর প্রতিটি দরজা খুলব নিজের স্বার্থের চাবিতে।

মোঃ তায়ীম খান
অর্থনীতি বিভাগ
গোবিপ্রবি

Link copied!