রবিবার ০২, আগস্ট ২০২৬

রবিবার ০২, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --

একের পর এক বিতর্কে রাকসু জিএস আম্মার

রাবি থেকে মো.রেজওয়ান

প্রকাশিত: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৭ পিএম

রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের তালিকা বেশ লম্বা ও পুরোনো। গত এক বছরে শিক্ষার্থীকে মারধর, মব সৃষ্টির অভিযোগ, শিক্ষক হেনস্তা, অনুদানের নামে অর্থ সংগ্রহ নিয়ে বিতর্ক, আওয়ামী লীগপন্থী ডিনদের পদত্যাগে চাপ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন ঘটনায় আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে প্রতিটি অভিযোগই অস্বীকার করেছেন তিনি।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামনের সারি থেকে আন্দোলনে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলালিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সালাউদ্দিন আম্মার। সেসময় স্লোগানের জন্য বেশ আলোচিত হয়েছিলেন সাবেক এই সমন্বয়ক। তবে অভ্যুত্থান পরবর্তী সময় থেকে নানা ঘটনায় সমালোচিত হন বর্তমান কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের এই জিএস।

সবশেষ গত ২৭ জুলাই সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তরে প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমানের সামনেই এক শিক্ষার্থীকে 'ছাত্রলীগ' আখ্যা দিয়ে চড় থাপ্পড় মারেন জিএস সালাউদ্দিন আম্মার ও এজিএস সালমান সাব্বির। এদিন দুপুরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ওই শিক্ষার্থী আনাসের বিরুদ্ধে রাকসু কার্যালয়ে পাল্টা হামলার অভিযোগ তুলে দ্বিতীয় দফায় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির ভিতরে ঢুকে আনাস ও তার দুই সঙ্গীকে বেধড়ক মারধর করেন আম্মার ও শিবিরের নেতাকর্মীরা। এসময় লাইব্রেরিতে অবস্থান করা শিক্ষার্থীরা মারধর ঠেকাতে গেলে তাদেরকেও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। 

এসময় আম্মার একটি বেলচা হাতে ওই শিক্ষার্থীকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তোরে মাইরা ফেলমু, পুইতা ফেলমু। পুইতা ফেলমু একেবারে।’ এসময় গালাগাল দিতেও দেখা যায় তাকে।

পরে প্রক্টর ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ওই দুই শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করলে অ্যাম্বুলেন্স থেকে বের করে আবারও বাঁশ দিয়ে সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসানকে পিটিয়ে আহত করা হয়। পরে রাকসু ও শিবিরের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আনাস ও মাহমুদুল হাসানকে জুলাই পরবর্তী  'ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রম' মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এঘটনায় একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করে রাবি প্রশাসন। 

অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আম্মার প্রথম আলোচনায় আসেন রাবি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদ হত্যাকাণ্ডের মামলায়। সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী মাসুদ ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর বিনোদপুর বাজারে সদ্যোজাত মেয়ের জন্য দুধ ও ওষুধ কিনতে গিয়ে অপহরণের শিকার হন। পরবর্তীতে রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানার সামনে ধারণ করা একটি ভিডিওতে অটো থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় নামাতে দেখা মাসুদকে। সেখানে সালাউদ্দিন আম্মারকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। বর্তমানে ঘটনাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে।

তবে আম্মারের দাবি তিনি আরেকটি ধর্ষণ ঘটনার মামলা দেখতে বোয়ালিয়া থানায় থাকায় তাকে সেই ঘটনায় জড়ানো হয়। 

আম্মার বলেন, ‘আমাকে ছাত্রলীগ তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে এই মামলার সাথে জড়িয়েছে। তারা কখনোই মাসুদ হত্যার বিচার চায়নি। আর আমি ক্যাম্পাসে আসার ১২-১৩ বছর আগে ছাত্রলীগ করা একজনকে কীভাবে চিনবো?’

গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত 'জুলাই ৩৬, মুক্তির উৎসব' অনুষ্ঠানের জন্য ৭০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭৬ লাখ টাকা চেয়ে চিঠি পাঠানোর অভিযোগ ওঠে আম্মারের বিরুদ্ধে। সেই ঘটনায়ও আম্মার চাঁদাবাজির বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন। তবে এসব সমালোচনার পর সেই অনুষ্ঠানের সকল আর্থিক হিসাব দেওয়ার কথা থাকলেও তা প্রকাশ করেননি তিনি।

গতবছর আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) 'পোষ্য কোটা' নিয়ে শিক্ষার্থীরা সরব হলে আম্মার ফের আলোচনায় আসেন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে ধস্তাধস্তি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। সেসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরি ভবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মাঈন উদ্দিনের বাসভবন ঘেরাও, তার গাড়িতে টাকা ছুঁড়ে মারা এবং শারীরিক লাঞ্চনার অভিযোগ ওঠে আম্মারের বিরুদ্ধে। 

এছাড়াও পোষ্য কোটা পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে একই সময় ভিসি, প্রো-ভিসিসহ দেড় শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারীকে দিনভর অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে আম্মার নেতৃত্ব দেন। 
এঘটনায় আম্মারের শাস্তির দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কয়েক দিন কর্মবিরতিও পালন করেন।

তবে সে ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী ঘনিষ্ঠ এই উপ-উপাচার্যকে অনেকটাই নিরব থাকতে দেখা যায়। তবে পোষ্য কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পান আম্মার। 

এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আম্মার 'আধিপত্যবিরোধী ঐক্য' প্যানেল থেকে নির্বাচন করেন। যদিও নির্বাচনী মাঠে এটি 'ডামি প্যানেল' হিসেবেই আলোচিত হয়। এই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মেহেদী সজীব পরে শাখা শিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

গত ২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত ছয় অনুষদের ডিনকে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে আম্মারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় ডিনদের পদত্যাগপত্র নিয়ে তাঁদের কার্যালয়ে তালা লাগানো হয়। পরে ছয় ডিনই পদত্যাগ করেন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একটি ব্যানার ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ ওঠে আম্মারের বিরুদ্ধে। ফেব্রুয়ারিতে ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতির সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো এসব ঘটনার প্রতিবাদে বিবৃতি দেয়।

অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আনোয়ার হোসেন বলেন, কোনো শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে আঘাত করার অধিকার কারও নেই। একজন নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।

গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ক্যাম্পাসে মব সংস্কৃতি ও পেশিশক্তির প্রদর্শন শিক্ষা পরিবেশের জন্য হুমকি। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত।

ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, রাকসু নির্বাচনে সালাউদ্দিন আম্মার শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর তারা তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করার প্রত্যাশা করেছিলেন। তবে তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের সময় আম্মারের ছাত্রশিবির-সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় শিক্ষার্থীদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি। তিনি আরও দাবি করেন, শিবির সরাসরি করতে চায় না এমন বিভিন্ন বিতর্কিত কাজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাগুলোতে সালাউদ্দিন আম্মারকে সামনে আনা হয়, যাতে সংগঠনটির ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন থাকে।

শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, আম্মার এই ক্যাম্পাসে যত অপকর্ম করে আসছে এবং এখনও যা করতেছে তা একজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি কোনোভাবেই করতে পারে না। এমনকি ছাত্রলীগ ট্যাগ দিয়ে লাইব্রেরীতে শিক্ষার্থীদের উপর যে হামলা করেছে, তার জন্য এখন জেলে থাকার কথা। আমরা প্রশাসনের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

এদিকে শিক্ষকদের একাংশের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আম্মারের কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করা যায় না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো সন্ত্রাসী বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শিক্ষাঙ্গনে থাকা উচিৎ না। যারা এসব করবে তাদের বিচার হওয়া উচিৎ। শিক্ষাঙ্গনে যারা মব কালচার করার চেষ্টা করে তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ মব কালচার শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ ঠিক রাখেনা, বরং ধ্বংস করে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) আব্দুল আলীম বলেন, সোমবারের ঘটনাসহ এরকম সব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি হবে। আমরা ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি করেছি। যাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।
আম্মারের বক্তব্য

সব অভিযোগ অস্বীকার করে সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, 'ছাত্রলীগ এবং তাদের মাদার সংগঠন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ ছড়াচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।'

Link copied!