রবিবার ০২, আগস্ট ২০২৬

রবিবার ০২, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --

ইউটিএল এর প্রথম বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত 

মোঃ আয়নুল ইসলাম

প্রকাশিত: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম

ছবি।ক্যাম্পাস রিপোর্ট

প্রতিষ্ঠার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে "বিপ্লব ও বিজয়ে ৩৬ জুলাই: নতুন প্রত্যাশায় আগামীর ভাবনা" প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন  ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল) এর "১ম বার্ষিক সম্মেলন-২০২৬" অনুষ্ঠিত হয়েছে।আজ শনিবার (১ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে 'উচ্চ শিক্ষায় উৎকর্ষ ও পেশাদারিত্ব: সময়ের অনিবার্য অপরিহার্যতা' শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ও রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. মোঃ আতিয়ার রহমান। প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, একবিংশ শতাব্দীতে একটি দেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অন্যতম ভিত্তি হলো দক্ষ মানবসম্পদ, যার মূল চালিকাশক্তি উচ্চ শিক্ষা। বর্তমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, বিগ ডেটা ও আইওটির মতো প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে উচ্চ শিক্ষাকে যুগোপযোগী ও কর্মমুখী করে তোলা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তাই উচ্চ শিক্ষায় উৎকর্ষ ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি। এ লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং শিল্পখাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। জ্ঞানভিত্তিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের জন্য উচ্চ শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার বিকল্প নেই; অন্যথায় ভবিষ্যতে মেধা ও দক্ষতার বড় সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক ড. মহমুদুর রহমান। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, জাতি গঠনের প্রশ্নে সফল হতে হলে প্রথমেই জাতির সঠিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করা জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে এ বিষয়ে নানা আলোচনা হলেও পরবর্তী সময়ে তা নিয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উচ্চশিক্ষার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম চেতনা ছিল ‘মেধা, না কোটা’ এবং ‘বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা’। কিন্তু বাস্তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনও দলীয়করণের প্রভাব স্পষ্ট। তাঁর দাবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু মেধাবী শিক্ষার্থী রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাননি, অথচ তুলনামূলক কম ফল করা ব্যক্তিরা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে চাকরি পেয়েছেন। তিনি বলেন, শিক্ষকদের একটি অংশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কেউ কেউ এই সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও দলীয়করণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর প্রতি মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানান।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড.  নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, তিনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত না থাকলেও নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, টিকে থাকা এবং সমাজের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, দেশে দলীয় রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা কমলেও রাজনীতিহীনতা কোনো সমাধান নয়; তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ, সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা ও ঐক্য বজায় রাখা জরুরি। তিনি গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের সামনে থাকা বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ধৈর্য, সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি শহীদদের আত্মত্যাগের ঋণ স্মরণ রেখে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার এবং ভালোকে ভালো ও খারাপকে খারাপ বলার পাশাপাশি বন্ধুত্ব, কৃতজ্ঞতা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। 

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ্ হাসান নকীব বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় সম্মিলিত ব্যর্থতার নেতিবাচক প্রভাব এখন স্পষ্ট, যা কাটিয়ে উঠতে গবেষণাবান্ধব পরিবেশ, কার্যকর ফলো-আপ এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিকতা ও অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্রের চাপ শিক্ষককে শিক্ষা ও গবেষণার মূল কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। গবেষণাভিত্তিক নীতি প্রণয়নের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)-এর দায়িত্ব হবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে শিক্ষকসমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের মাধ্যমে জাতির সম্মিলিত স্মৃতির অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা। একই সঙ্গে তিনি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, অধ্যাপক আতাউর রহমান বিশ্বাসকে স্মরণ এবং ইউটিএলকে সব মত ও চিন্তার মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখার আহ্বান জানান। 

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড.  মো. হায়দার আলী বলেন, উচ্চশিক্ষায় এআই ও প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, প্রাথমিক শিক্ষায় ভারী সিলেবাসের বদলে জাপানের মতো জীবনমুখী ও নৈতিক শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া, এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে মুদ্রাস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে পে-স্কেল ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে নীতিনির্ধারক মহলে নতুন করে ভাবা জরুরি।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড.  মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্তমান ডিজিটাল ও অরাজক সমাজে শিক্ষার্থীদের মাঝে পিতা-মাতা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা এবং সত্য বলার মতো চিরন্তন নৈতিক মূল্যবোধগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, যা পুনরুদ্ধারে শিক্ষকদের পড়াশোনার পাশাপাশি ক্লাসে নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গবেষণার মান বাড়াতে ইউটিএল কর্তৃপক্ষকে একটি কমিটি গঠন করে মৌলিক গবেষণাগুলো সমাজের সামনে তুলে ধরার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ- উপচার্য অধ্যাপক ড.  মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও গবেষণাকে যুগোপযোগী করতে অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। অবসর গ্রহণের মাধ্যমে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না;  বরং তাঁদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো উচিত।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইউটিএল এর আহ্বায়ক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড.  যুবাইর মোহাম্মদ এহসানুল হক। 

উল্লেখ্য, জ্ঞান, আত্মমর্যাদা, বিশ্বাস ও স্বাধীনতা এই চারটি মূলনীতিকে ধারণ করে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)।

Link copied!