শুক্রবার ৩১, জুলাই ২০২৬

শুক্রবার ৩১, জুলাই ২০২৬ -- : -- --

জাকসু ভিপির দাবি পূরণে আবাসন নীতিতে পরিবর্তন !

জাবি থেকে আব্দুর রহমান

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম

ফাইল ফটো

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পদের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বরাদ্দকৃত আবাসিক হলে অবস্থানের সুযোগ দিয়ে নতুন অফিস আদেশ জারি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, জাকসু সহ-সভাপতি (ভিপি) আব্দুর রশিদ জিতুর দাবি পূরণে প্রশাসন আবাসন নীতিতে পরিবর্তন এনেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান ছাত্র শৃঙ্খলা বিধি ও প্রচলিত নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বুধবার (২৯ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বলা হয়, জাকসু ও বিভিন্ন হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাঁদের পদের মেয়াদ বহাল থাকা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বরাদ্দকৃত আবাসিক হলে অবস্থান করতে পারবেন।

এর আগে জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু গণমাধ্যমে বলেছিলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনের স্বার্থে ছাত্রত্ব শেষ হলেও প্রশাসনিকভাবে হলে থাকার অনুমতি দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে ছাত্রত্ব শেষ হওয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও প্রশাসনের একটি সুস্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শৃঙ্খলাসংক্রান্ত অধ্যাদেশ-২০১৮-এর ৫(ট) ধারা অনুযায়ী, স্নাতকোত্তরের চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাত দিনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র, চিকিৎসা ও গ্রন্থাগার কার্ড জমা দিয়ে আবাসিক হল ত্যাগ করতে হবে। বিধি অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর পরীক্ষার ফল স্থগিত রাখার বিধানও রয়েছে।

অন্যদিকে প্রশাসনের নতুন সিদ্ধান্ত প্রকাশের পরপরই বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, জাকসুর একাধিক প্রতিনিধি এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
জাতীয় ছাত্রশক্তি, জাবি শাখার সভাপতি জিয়া উদ্দিন আয়ান বলেন, জাকসু ভিপির ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরও হলে অবস্থান নিয়ে আগে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। এরপরই প্রশাসন নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। এতে একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সুবিধা দিতেই নিয়ম পরিবর্তন করা হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে।

জাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আহসান লাবিব বলেন, জাকসুর পক্ষ থেকে এমন কোনো দাবি প্রশাসনের কাছে জানানো হয়নি। বরং ছাত্রত্ব শেষ হলে হল ত্যাগ করাই দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়ম। তাঁর মতে, নতুন এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আবাসন সংকট আরও বাড়াবে এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে হলে অবস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। তিনি আদেশটি প্রত্যাহারের দাবি জানান।

জাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, জাকসু বডির সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই প্রশাসন নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গঠনতন্ত্র সংশোধন ছাড়া এ ধরনের আদেশ জারি জাকসুর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর মাধ্যমে হলে অবৈধ অবস্থানকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

জাবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, জাকসুর প্রতিনিধিরা আবেদন না করলেও প্রশাসন তাদের এ সুবিধা দিয়েছে। অথচ সম্প্রতি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার অজুহাতে ছাত্রদলের শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তকে দ্বিমুখী নীতির বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করেন।

জাবি ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ফাইজান আহমেদ অর্কও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করে লেখেন, “মহামান্য জাকসু এবং হল সংসদ প্রতিনিধিদের জন্য কি আলাদা ভিআইপি প্যাকেজ চালু হলো? যেখানে ছাত্রত্ব চলে যাওয়ার পর পদে থাকাটাই অবৈধ, সেখানে প্রশাসন তাদের সহায়তা করে ঘটা করে অ্যানাউন্সমেন্ট দেয় হলের রুমে থাকার জন্য!”

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানা যায়, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আব্দুর রশিদ জিতু জাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এক বছর ড্রপ নেন। পরে ভিপি নির্বাচিত হলেও নির্ধারিত সময়ে স্নাতকোত্তরের ৫০৪ নম্বর কোর্স সম্পন্ন করতে পারেননি। ফলে তাঁর কার্যত ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে।

এ কারণে গত ২৭ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে জাকসু থেকে ভিপি ও জিএসসহ পাঁচজনকে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হলেও বৈধ ছাত্রত্ব না থাকায় ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু সিনেট অধিবেশনে অংশ নিতে পারেননি।

এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী ছাত্রত্ব শেষ হলে কারও হলে থাকার বৈধতা নেই। পরীক্ষা শেষের এক সপ্তাহের মধ্যে হল ছাড়ার বিধান সাধারণ শিক্ষার্থী, ছাত্রনেতা ও জাকসু প্রতিনিধি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। 

তবে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর জানতে চাইলে তিনি বলেন, জাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী একজন বৈধ শিক্ষার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর ছাত্রত্ব শেষ হলেও তিনি এক বছরের জন্য ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে হলে অবস্থান না করলে তাঁদের পক্ষে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে প্রশাসনিক সভায় জাকসু ও হল সংসদের প্রতিনিধিদের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত হলে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তাঁদের মেয়াদ আর মাত্র দুই থেকে তিন মাস বাকি। এটি কোনো একজনকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়; বরং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের স্বার্থেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে জাকসু এবং ইসলামী ছাত্রশিবির। বৃহস্পতিবার জাকসুর সাধারণ সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলামের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে অবিলম্বে এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। এছাড়া শাখা শিবিরের প্রচার সম্পাদক ফেরদৌস আল হাসান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে ছাত্রত্ব শেষেও জাকসু ও হল সংসদ প্রতিনিধিদের হলে অবস্থানের মত ছাত্র শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ বিরোধী সিদ্ধান্তের নিন্দা ও প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

Link copied!