রবিবার ০৮, নভেম্বর ২০২৬

রবিবার ০৮, নভেম্বর ২০২৬ -- : -- --

জাবিপ্রবিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে পাঁচ শিক্ষক নিয়োগ, ইউজিসির সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে দেওয়া হচ্ছে বেতন

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০৮ পিএম

ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট

জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবিপ্রবি) নিয়োগসংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণ না করে পাঁচ শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সাম্প্রতিক অডিট আপত্তিতে বিষয়টি উঠে এসেছে। এ পাঁচ শিক্ষকের বেতন-ভাতা বাবদ বাজেটে কোনো বরাদ্দ না রাখার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতে অর্থ ছাড়ের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে কমিশন। তবে ইউজিসির সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক সুপারিশ, প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিতর্কিত এসব নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছিল।

ইউজিসির বাজেট অ্যাসেসমেন্ট দল গত ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল বাজেট পর্যালোচনা করে। এ সময় মোট ২৬টি পর্যবেক্ষণ চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে প্রথম পর্যবেক্ষণটি ছিল অননুমোদিত শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত।

কমিশনের অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী প্রভাষক পদে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ছিল ৩০ বছর এবং সহকারী অধ্যাপক পদে ৩৫ বছর। কিন্তু সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ব্যক্তিগত নথিপত্র যাচাই করে দেখা যায়, আবেদনের শেষ তারিখে পাঁচজনের বয়সই নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছিল।

তাঁরা হলেন—সমাজকর্ম বিভাগের ড. এ এইচ এম মাহবুবুর রহমান, যাঁর বয়স ছিল ৪৫ বছর ৮ মাস; সিএসই বিভাগের ড. মো. মাহমুদুল আলম, যাঁর বয়স ছিল ৪০ বছর ১ মাস; গণিত বিভাগের ড. মুহাম্মদ শাহ জালাল, যাঁর বয়স ছিল ৪২ বছর ১০ মাস; হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ড. সৈয়দ নাজমুল হুদা, যাঁর বয়স ছিল ৩৮ বছর ৯ মাস এবং সমাজকর্ম বিভাগের ড. আল মামুন সরকার, যাঁর বয়স ছিল ৩৯ বছর ৫ মাস। তাঁদের মধ্যে প্রথম তিনজন সহকারী অধ্যাপক এবং শেষ দুজন প্রভাষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন।

অডিট আপত্তিতে আরও বলা হয়, বিধিবহির্ভূত এসব নিয়োগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান ও আইন অনুযায়ী দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় সংশ্লিষ্ট পদগুলোর বেতন-ভাতা বাবদ বাজেটে কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি।

এ ছাড়া কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পর্যবেক্ষণগুলো নিষ্পত্তির জন্য একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এ কারণে কয়েকটি খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এসব আপত্তি নিষ্পত্তি না হলে ভবিষ্যতে চাহিদা ও বরাদ্দের ব্যবধান আরও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে ইউজিসি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একই ধরনের অডিট আপত্তির পর দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন বন্ধ ও চাকরিচ্যুতিসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অথচ জাবিপ্রবিতে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ইউজিসি বাজেটে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন বাবদ বরাদ্দ না রাখলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁদের বেতন দিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. সারোয়ার জাহান বলেন, ইউজিসির চিঠি তাঁরা পেয়েছেন এবং এর জবাব দেওয়া হবে। চিঠি ইস্যুর চার মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না কিংবা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। ইউজিসি পরবর্তী সময়ে আরও কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইলে তখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট পাঁচ শিক্ষক বেতন পাচ্ছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে রেজিস্ট্রার বলেন, তাঁরা বেতন পাচ্ছেন। তবে কোন খাত থেকে তাঁদের বেতন দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে হিসাব শাখা বিস্তারিত জানাতে পারবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব ও অর্থ বিভাগের উপপরিচালক আবদুল জলিল মিয়া বলেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন নিয়মিত বেতন-ভাতা খাত থেকেই পরিশোধ করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত কোনো নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা বেতন প্রদান অব্যাহত রাখবেন। বরাদ্দের অর্থ শেষ হয়ে গেলে সম্ভাব্য ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের বলে জানান তিনি।

এদিকে, এ ধরনের আর্থিক ঘাটতির প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক বাজেটেও পড়ছে। ইউজিসি জানিয়েছে, এসব পর্যবেক্ষণ নিষ্পত্তি না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা ও বরাদ্দের মধ্যে ব্যবধান আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিএসই বিভাগের ড. মো. মাহমুদুল আলম তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিতর্কিত এসব নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগপ্রাপ্ত এসব আওয়ামীপন্থী শিক্ষক নিজেদের যোগ্যতা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন আড়াল করতে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।

ড. এ এইচ এম মাহবুবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে তিনি ‘মুজিব শতবর্ষের ইতিহাস’ গ্রন্থ রচনা করেন। এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কলাম লিখে ছাত্র আন্দোলনের বিরোধিতা এবং দমন-পীড়নের পক্ষে বৈধতা তৈরির চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াকে নিয়ে কটূক্তিমূলক লেখা প্রকাশের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

অন্যদিকে, ড. সৈয়দ নাজমুল হুদা ও ড. মাহমুদুল আলম দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ‘রোড টু স্মার্ট বাংলাদেশ’ কর্মসূচিতে নৌকার পক্ষে তৃণমূল পর্যায়ে ভোট প্রার্থনার ক্যাম্পেইনার ও প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ড. মো. আল মামুন সরকার ‘উন্নয়নের রোল মডেল শেখ হাসিনা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এবং টেলিভিশনের টকশোতে শেখ ফজিলাতুন্নেছাকে নিয়ে আলোচক হিসেবে অংশ নেন।

Link copied!