প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১২ এএম
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ভবিষ্যৎ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে আবাসিক প্রশিক্ষণার্থী রয়েছেন প্রায় ৬৫০ থেকে ৭০০ জনেরও বেশি। কিন্তু শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের এই প্রতিষ্ঠানেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পরিচ্ছন্নতা ও আবাসিক পরিবেশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, কলেজের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকছে। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, ঝোপঝাড় পরিষ্কার, পানি জমার স্থান শনাক্তকরণ এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে পর্যাপ্ত উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তাঁদের দাবি, কলেজের আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মশার উপদ্রব বেড়েছে এবং একাধিক প্রশিক্ষণার্থী ও শিক্ষার্থী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ বিষয়ে বিএড চতুর্থ বর্ষের প্রশিক্ষণার্থী কামাল বলেন, “বর্তমানে আমাদের সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ মশার প্রাদুর্ভাব এতটাই বেড়েছে যে, কোথাও ঠিকমতো বসে থাকা তো দূরের কথা, দাঁড়িয়ে থাকাও যাচ্ছে না। এ বিষয়ে প্রশাসনকে বারবার অবহিত করা হলেও তারা কোনো কর্ণপাত করছে না। এখন পর্যন্ত তাদের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি না। এভাবে চলতে থাকলে আমরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারি।”
অন্যদিকে, বিএড প্রশিক্ষণার্থী মারুফা আক্তার বলেন, “আমাদের হোস্টেলে এত পরিমাণ মশা বেড়েছে যে এখানে বসবাস করাই অযোগ্য হয়ে পড়ছে। অথচ মশক নিধনে হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি কলেজ প্রশাসনও বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না।”
শিক্ষার্থীদের এসব বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আবাসিক পরিবেশে মশার উপদ্রব তাঁদের দৈনন্দিন জীবন ও স্বাভাবিক পড়াশোনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে তাঁরা মনে করছেন। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষার্থীদের আবাসন ও স্বাস্থ্যসুরক্ষার দায়িত্বে থাকা কলেজ প্রশাসন ডেঙ্গু প্রতিরোধে কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে? অধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে প্রশিক্ষণার্থীদের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।
দেশজুড়ে ডেঙ্গুর ভয়াবহ চিত্র: এক দিনে হাসপাতালে ১,৮৮৬ জন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) তথ্যের বরাত দিয়ে ৩০ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, আগের ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৮৮৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মারা গেছেন আরও ৬ জন।
চলতি বছরে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মোট ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৫ জনে। আর মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১৫ জনে। অক্টোবর মাসেই ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১৭০ জন। অর্থাৎ অক্টোবরের ৩০ দিন হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ দশমিক ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৮৮৬ জন।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে ৭৫৫ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে এই সংখ্যা পুরো ঢাকা বিভাগের; শুধু ঢাকা মহানগরের নয়।
গবেষণায় উঠে এসেছে, জমে থাকা পানি ও পরিত্যক্ত বর্জ্য ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ায়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান বাহক এডিস মশা সাধারণত মানুষের বসতবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশে জমে থাকা পানির পাত্রে বংশবিস্তার করে। পরিত্যক্ত বোতল, প্লাস্টিকের পাত্র, টায়ার, ড্রাম, ফুলের টব ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যে বৃষ্টির পানি জমে থাকলে সেগুলো এডিস মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে।
ঢাকা শহরে পরিচালিত গবেষণাতেও এডিস মশার প্রজননস্থল হিসেবে পরিত্যক্ত গাড়ির যন্ত্রাংশ, নির্মাণসামগ্রী, টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম ও অন্যান্য পানিধারণকারী পাত্রের গুরুত্ব উঠে এসেছে।
২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ঢাকার ১২টি ওয়ার্ডে পরিচালিত একটি গবেষণায় ১২ হাজার ৬৮০টি অপরিণত মশার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, এসব নমুনার প্রায় ৮২ শতাংশ ছিল এডিস ইজিপ্টাই। পরিত্যক্ত গাড়ির যন্ত্রাংশ ও নির্মাণসামগ্রী এডিস মশার উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়।
অন্যদিকে, WHO-এর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু কীটনাশক ছিটানো যথেষ্ট নয়; মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, কঠিন বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা, পানি জমতে না দেওয়া।
