প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম
কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা খাদিশিল্পের সংকট মোকাবিলা, বাজার সম্প্রসারণ ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষক, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। তাঁরা বলেছেন, ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক নকশা, মানসম্মত কাঁচামাল, দক্ষতা উন্নয়ন ও কার্যকর বিপণন নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) প্রতিষ্ঠাতা ড. আখতার হামিদ খানের ২৭তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার বড় কামতায় এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) সদস্য ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস। সভাপতিত্ব করেন বার্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বার্ডের পরিচালক (প্রশাসন) আইরীন পারভীন, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন বিভাগের প্রধান আইয়ুব আলী, ঢাকার ফ্যাশন ডিজাইন প্রতিষ্ঠান কারুভূমির প্রতিনিধি ফায়কুজ্জামান বাদশা এবং কুমিল্লার বিশিষ্ট খাদি ব্যবসায়ী প্রদীপ কান্তি রাহা। এ ছাড়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন একা তালুকদার, সুপ্রতিক চৌধুরী ও প্রান্ত ঘোষ।
সেমিনারে ‘কুমিল্লার হাতে বোনা খাদিশিল্পের বাজার সম্প্রসারণ ও সক্ষমতা উন্নয়ন’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বার্ডের পরিচালক ও গবেষণার আহ্বায়ক ড. শেখ মাসুদুর রহমান। গবেষণার অংশ হিসেবে তৈরি করা হয় ৩ হাজার ৫০০ গজ খাদি কাপড়। ঢাকার ফ্যাশন ডিজাইন প্রতিষ্ঠান কারুভূমির সহযোগিতায় শাড়ি, পাঞ্জাবি, জ্যাকেট ও চাদরসহ ১৭ ধরনের খাদিপণ্যও তৈরি করা হয়।
গবেষণায় খাদিশিল্পের উন্নয়নে মানসম্মত তুলার সরবরাহ নিশ্চিত করা, আধুনিক অম্বর চরকার ব্যবহার, তাঁতশিল্পীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়। বক্তারা মনে করেন, ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
সেমিনারে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী একা তালুকদার বলেন "এমন একটি উদ্যোগের অংশ হতে পেরে আমরা আনন্দিত। আমাদের মতো তরুণেরা কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী খাঁটি হাতে বোনা খাদিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চাই। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে খাঁটি খাদি বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় পণ্য হয়ে উঠতে পারে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে ‘বয়ন’ টিমের মাধ্যমে খাদির বিভিন্ন নতুন পণ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছি। আমাদের লক্ষ্য, খাদির ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে একে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা।"
প্রধান অতিথি ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস বলেন, খাদি শুধু মুনাফা অর্জনের শিল্প নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এ শিল্পের সংকট সমাধানে প্রান্তিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া, খাঁটি খাদির পরিচিতি প্রতিষ্ঠা এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা জরুরি।
সভাপতির বক্তব্যে বার্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, "তাঁতশিল্পী, খাদি ব্যবসায়ী, তুলা উৎপাদনকারী, সুতা কাটার নারী, উদ্যোক্তা, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এই সেমিনারে গবেষণার আওতায় তৈরি সতেরো ধরনের খাদিপণ্যের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।"
সেমিনারে গবেষণার আওতায় তৈরি বিভিন্ন ধরনের খাদিপণ্য প্রদর্শন করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে স্থানীয় উৎপাদকদের অভিজ্ঞতা, গবেষণালব্ধ সুপারিশ, তরুণদের সৃজনশীলতা এবং বাজারের চাহিদাকে একই উদ্যোগের আওতায় আনতে হবে। এতে কুমিল্লার খাদিশিল্পের ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি নতুন বাজার তৈরির সুযোগও বাড়তে পারে।
