মঙ্গলবার ১৩, জানুয়ারি ২০২৬

মঙ্গলবার ১৩, জানুয়ারি ২০২৬ -- : -- --

মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:০৫ এএম

ফাইল ফটো।

মূলত তিনটি ধারায় দ্বীনের খেদমত আঞ্জাম দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৪১৬ হিজরীর শাওয়াল (মোতাবেক ১৯৯৬ খৃস্টাব্দের মার্চ) মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা। ধারা তিনটির শিরোনাম হচ্ছে : ১. দাওয়াত, ২. তালীম ও ৩. তাসনীফ।

মৌলিক বিভাগগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয়

দাওয়াহ

দাওয়াহ-এর অর্থ আহ্বান করা। আল্লাহ তাআলার বান্দাদেরকে কিভাবে তাঁর পথে আহ্বান করা যায়? কিভাবে তাদেরকে ধাবিত করা যায় ইহকালীন ও পরকালীন শান্তির একমাত্র বিধান-শরীয়তে মুহাম্মাদীর প্রতি? কিভাবে আশরাফুল মাখলুকাত মানব সমাজ তার শ্রেষ্ঠত্বের দাবি পূরণ করবে? এ সকল বিষয়ের সঠিক জবাব খোঁজ করা এবং সম্ভাব্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এ বিভাগের উদ্দেশ্য। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে মারকায চায় উচ্চতর বাস্তবমুখি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এমন একদল মেধাবী দাঈ (আল্লাহর পথে আহ্বানকারী) তৈরি করতে, যারা :

ক) স্থান-কাল-পাত্র ভেদে কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক হিকমত অবলম্বনের মাধ্যমে মানুষকে আহ্বান করবে চির শান্তির দ্বীন ইসলামের পথে।

খ) সাধারণ শিক্ষিত সমাজ ও আলেমদের মাঝে বিরাজমান দূরত্ব কমিয়ে এনে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের মনে ইসলামের আলো জ্বেলে তাদেরকেও দাঈ রূপে তৈরি করতে সচেষ্ট হবে।

গ) ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের বিশেষত পাশ্চাত্যের  ইসলাম বিদ্বেষীদের ছড়ানো মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডা, শাশ্বত ইসলামের কল্যাণমুখি ইনসাফভিত্তিক বিধানের বিরুদ্ধে তাদের অন্যায় বিষোদগার সম্পর্কে সদা জাগ্রত থাকবে এবং তাদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে মুসলমানদের ঈমান-আমলের হিফাযতে যথাযথ ভূমিকা রাখবে।

ঘ) আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের মৌলিক  আকীদা-বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার সঠিক উপস্থাপন এবং সর্বপ্রকার বিদআত, কুসংস্কার, অসার ও ভিত্তিহীন আকীদা-বিশ্বাসের অপনোদন করবে।

তালীম

মারকাযুদ দাওয়াহর মৌলিক কার্যক্রমের দ্বিতীয় ধারাটি হচ্ছে তালীম তথা শিক্ষা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমি শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছি। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির উন্নতির কথা কল্পনা করা যায় না। বলাবাহুল্য, সে শিক্ষা হল ওহীভিত্তিক শিক্ষা, যা মানব জাতির ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ ও নৈতিক উন্নতি সাধনে সক্ষম। তাই মারকাযুদ দাওয়া চায় এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা :

১.  যার মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত কোনো ধরনের ভেদাভেদ ছাড়াই সকল শিক্ষার্থী কুরআন, হাদীস, ফিকহ ও আকাইদ সংক্রান্ত জরুরি বিষয়াদির উপর প্রয়োজনীয় ইলম অর্জন করতে সক্ষম হবে। সাথে সাথে মাতৃভাষা, আন্তর্জাতিক ভাষা, ইসলামী ভাষা (আরবী), অংক, বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস, কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি বিষয়াদির উপরও অর্জন করবে মৌলিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের জ্ঞান।

২.  মাধ্যমিক পর্যায়ের পর শিক্ষার্থীরা মেধা, মনোযোগ ও রুচির ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে যাবে বিভিন্ন ভাগে। উচ্চতর দ্বীনী শিক্ষা অর্জনের পর কেউ হবে যোগ্য আলেমে দ্বীন। আবার জাগতিক শিক্ষার বিভিন্ন বিভাগে অধ্যয়নের মাধ্যমে গড়ে উঠবে বিভিন্ন পেশার যোগ্য ও আদর্শ জনবল।

এভাবে সমাজের যে শ্রেণিতেই একজন মুসলমান কর্মরত থাকবে সে মনেপ্রাণে ইসলামের আদর্শ লালন করার কারণে পেশাগতভাবে যেমন হবে দায়িত্বশীল ও কর্মঠ তেমনি থাকবে সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত। তখন কোনো চিকিৎসক রোগীকে, রোগী চিকিৎসককে, কোনো ক্রেতা বিক্রেতাকে, বিক্রেতা তার ক্রেতাকে, মজদুর মালিককে এবং মালিক মজদুরকে ঠকানোর চিন্তাও করবে না। আর এভাবেই একদিন গড়ে উঠবে কাঙ্খিত আদর্শ সমাজব্যবস্থা।

৩.  যারা আলেমে দ্বীন হবেন তাদের মধ্য থেকে উলে­খযোগ্য সংখ্যক মেধাবী ও কর্মঠ যুবক দ্বীনী ইলমের বিভিন্ন বিভাগে উচ্চতর গবেষণায় রত হবেন। উলূমুল কুরআন (তাফসীর, উসূলে তাফসীর ইত্যাদি), উলূমুল হাদীস, ফিকহ (ইসলামী আইন), ইফতা, আরবী সাহিত্য, ইতিহাস এবং অন্যান্য ইসলামী বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ উস্তাদের তত্ত্বাবধানে সর্বোচ্চ প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে তারা নিজ নিজ বিভাগে দক্ষতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ হিসাবে গড়ে উঠবেন।

৪.  এ শিক্ষা ব্যবস্থার সিলেবাসে পরিবর্তনের সাথে সাথে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন ঘটবে পাঠদান পদ্ধতিতে। নাহব-সরফ তথা আরবী ব্যাকরণের পাঠদানে যেমনিভাবে গ্রহণ করতে হবে সহজ, সরল ও আধুনিক পদ্ধতি, তেমনিভাবে তাফসীর, হাদীস, ইতিহাস ইত্যাদির অধ্যাপনা হবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিদগ্ধজনের মাধ্যমে বিশ্লেষণধর্মী যুযোগযোগী পন্থায়। এসব বিষয়ের আলোচনা এমনভাবে হতে হবে, যেন কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আধুনিক বিশ্বের সমস্যাবলি ও প্রশ্নাবলির উত্তম সমাধান ফুটে উঠে।

এমনিভাবে ফিকহ বিষয়ের পাঠদানের ক্ষেত্রে সমকালীন উত্থাপিত প্রশ্নাবলির জবাবও থাকবে অধ্যাপনার বিশেষ অংশ। বিচার ও ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ের অধ্যয়ন হবে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে।

মূলত মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া চায় এমন একটি যৌথ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, যাতে শিক্ষা শেষে যেকোনো জাগতিক পেশায় নিয়োজিত একজন ব্যক্তি হবেন সত্যিকারের মুসলমান। তখন ইসলামী অনুশাসন মেনে চলা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং নীতিবান আমলা দ্বারা আল্লাহ তাআলা প্রদর্শিত সঠিক পথে পরিচালিত হবে সমাজ। সাথে সাথে ইসলামী বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ আলেমগণও হবেন দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় জাগতিক বিষয়াদি এবং আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়াদি সম্পর্কে সচেতন ও প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অধিকারী।

তাসনীফ (রচনাসংকলন ও অনুবাদ বিভাগ)

এটি মারকাযের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষায়িত বিভাগ। আল্লাহ তাআলার মেহেরবানিতে এর অধীনে নিম্নোক্ত শাখাগুলোতে কাজ চলমান রয়েছে :

ক) হাদীস, ফিকহ, তাফসীর, আকাইদ, আদব ও তারীখ ইত্যাদির প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা, সংস্করণ ও মুদ্রণ।

খ) সীরাত সম্পর্কিত রেওয়ায়েতসমূহ যাচাই-বাছাই করতঃ একটি সহীহ সীরাত গ্রন্থ রচনা করা।

গ) ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে পরস্পর বিরোধপূর্ণ বর্ণনাসমূহের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইপূর্বক একটি সহীহ গ্রন্থ প্রণয়ন করা।

ঘ) প্রাচ্যবিদদের রচনাবলির ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করে তাদের ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন এবং এর বিপরীতে সহীহ ও বিশুদ্ধ মতাদর্শ পেশ করা।

এ ছাড়াও আরো মৌলিক জরুরি বিষয়াবলির উপর গবেষণামূলক প্রামাণ্য গ্রন্থাবলি প্রণয়ন করা।

আততাখাসসুস

বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেক্ষাপটে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার পথচলা শুরু হয় মূলত গবেষণামূলক কার্যক্রম দিয়ে। উলূমে ইসলামিয়ার বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষা-গবেষণা, প্রশিক্ষণ, লেখালেখি, দাওয়াহ ইত্যাদি বিষয়ের কাজগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে মারকায মৌলিকভাবে দাওয়াহ, তালীম ও তাসনীফ তিনটি শাখায় তার কার্যক্রম শুরু করে।

তালীম তথা শিক্ষার ক্ষেত্রে একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত যুগ উপযোগী সিলেবাস ও যথাযথ নীতিমালার মাধ্যমে সর্বস্তরে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা মারকাযুদ দাওয়াহর থাকলেও বাস্তবে উচ্চতর শিক্ষার মাধ্যমে মারকাযুদ দাওয়াহর এই বিভাগটি শুরু হয়েছে। উচ্চতর শিক্ষা কারিকুলামের এই স্তরটি হল التخصص (আততাখাসসুস) বা স্পেশালাইজেশন প্রোগ্রাম।

বর্তমান বিশ্বে স্পেশালাইজেশন বা বিশেষ অভিজ্ঞতার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। জাগতিক কোনো বিষয়ে কার্যক্রম সম্পাদনের প্রয়োজন হলে মানুষ সে বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হয়। ইসলামের ইতিহাস খোঁজ করলে দেখা যাবে যে, সালাফে সালেহীনের যুগেও সকল মনীষী সব বিষয়ে (হাদীস, তাফসীর ও ফিকহ ইত্যাদি) এর খেদমত এককভাবে আঞ্জাম দিতেন না; বরং সাধারণত একেকজন একেক দিককে তাঁদের মৌলিক গবেষণার বিষয় বানিয়ে নিয়েছিলেন। ফলে কেউ হাদীস বিশারদ, কেউ তাফসীরবিদ, কেউ ফিকহবিদ, কেউ মুআররিখ বা ইতিহাসবিদ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন।

এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, কুরআন হাদীস তথা ইসলামী উলূমের প্রতিটি শাখায় (যেমন তাফসীর, হাদীস ও ফিকহ ইত্যাদি) কিছু আলেমকে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ হতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মুতালাআ (অধ্যয়ন) ও গবেষণার মাধ্যমে গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করতে হবে। ফলে তার পক্ষে দ্বীনী ইলমের সে শাখায় দক্ষতার সাথে অবদান রাখা সম্ভব হবে।

মারকাযুদ দাওয়াহয় তাখাসসুসের আপাতত যে বিভাগগুলো চালু রয়েছে সেগুলোর সিলেবাস সাজানো হয়েছে নিজস্ব পদ্ধতিতে, বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে। এটি প্রস্তুত করতে গিয়ে উপমহাদেশ ও ইসলামী বিশ্বের প্রখ্যাত দ্বীনী বিদ্যাপীঠগুলোর সিলেবাসের প্রতিও দৃষ্টি রাখা হয়েছে। এ সিলেবাসটি অনুমোদিত ও প্রশংসিত হয়েছে উপমহাদেশের বহু উলামায়ে কেরাম কর্তৃক। হযরত মাওলানা আবদুর রশীদ নোমানী রাহ., হযরত মাওলানা ইউসুফ লুধিয়ানভী রাহ., মুফতী মুহাম্মাদ রফী উসমানী, জাস্টিজ মাওলানা তাকী উছমানী, মুফতী নিজামুদ্দীন শামজী, হযরত মাওলানা আবদুল হক আজমী, মুফতী হাবীবুর রহমান খায়রাবাদী তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া শাইখুল হাদীস আজিজুল হক রাহ., হযরত মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী রাহ., খতীব ওবায়দুল হক রাহ., হযরত মাওলানা আবদুল হাফিয রাহ., মুফতী আবদুস সালাম রাহ.সহ দেশের তৎকালীন বহু মুরব্বী ও প্রখ্যাত উলামায়ে কেরামও মারকাযুদ দাওয়াহর শিক্ষা কারিকুলাম এবং এর তালীমী ও তরবিয়তী পদ্ধতির প্রশংসা করে এর কর্তৃপক্ষকে উৎসাহ যুগিয়েছেন।

Link copied!